Back

ⓘ ঋতুপর্ণ




                                     

ⓘ ঋতুপর্ণ

ঋতুপর্ণ অযােধ্যার রাজা । মহাভারতে ঋতুপর্ণকে ভঙ্গাসুরের পুত্র বা ভাঙ্গাসুরি বলে উল্লেখ করা হয়েছে । তবে হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশ ভট্টাচার্য অনুদিত মহাভারত-এ ‘ ভাগস্বরি ’ এই পাঠ ধৃত হয়েছে । অর্থাৎ ইনি ভগস্বরের পুত্র । ভগস্বর বা ভঙ্গাসুরের পুত্র ঋতুপর্ণ কোন রাজবংশসম্ভূত ছিলেন এ বিষয়ে মহাভারতের পাঠ থেকে সংশয় হওয়াটাই স্বাভাবিক । বৈদিক সাহিত্যে আমরা জনৈক রাজা ভঙ্গাশ্বিনের নাম উল্লেখ পাওয়া যায়, যিনি অযােধ্যার রাজা ছিলেন । তাঁর পুত্রের নামও ঋতুপর্ণ । আপস্তম্ব শ্ৰৌতসূত্রে ঋতুপর্ণ এবং কয়ােবিধিকে ভাঙ্গাশ্বিন বলে উল্লেখ করা হয়েছে । বৌধায়ন শ্ৰৌতসূত্রেও ঋতুপর্ণ যে রাজা ভঙ্গাশ্বিনের পুত্র ছিলেন এ বিষয়ে স্পষ্ট উল্লেখ আছে । তবে মহাভারতে কর্কেটক নাগ নলকে ঋতুপর্ণ রাজার আশ্রয়ে যেতে পরামর্শ দেবার সময় ঋতুপর্ণরাজাকে ইক্ষ্বাকুবংশসম্ভূত বলে উল্লেখ করেছেন । শ্রীমদভাগবত, বিষ্ণু, মৎস্য, বায়ু ব্রহ্মাণ্ড প্রভৃতি পুরাণে একথা স্বীকার করা হয়েছে । সেখানে ইক্ষ্বাকুবংশীয় রাজা ঋতুপর্ণকে অম্বরীষের পৌত্র অযুতায়ু বা অযুতজিৎ - এর পুত্র বলা হয়েছে । ইনি ইক্ষ্বাকুবংশীয় রাজা কল্মষপাদের পিতা, মতান্তরে পিতামহ । শিবপুরাণ ও ব্রহ্মপুরাণে তাঁর পুত্র অনুপর্ণ বা আৰ্ত্তপর্ণকে কল্মষপাদের পিতা বলা হয়েছে । ইক্ষ্ববংশীয় ঋতুপর্ণ যে নিষধরাজ নলের সখা ছিলেন এ বিষয়ে পুরাণে স্পষ্ট উল্লেখ আছে । ভাঙ্গাশ্বিন ঋতুপর্ণ এবং ইক্ষাকুবংশীয় ঋতুপর্ণ দুজনেই যেহেতু অযােধ্যার রাজা ছিলেন, সেহেতু মনে হয় মহাভারতের পাঠে এই দুই ঋতুপর্ণ রাজা এক হয়ে গেছেন ।

ঋতুপর্ণ পাশাখেলায় অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। মহাভারতের বনপর্বে নল-দময়ন্তীর বৃত্তান্তে ঋতুপর্ণের কথা বলা হয়েছে।

পাশাখেলায় সর্বস্ব হারিয়ে নল যখন বনমধ্যে বিচরণ করছিলেন, তখন কর্কোটক নাগ তাঁকে ছদ্মবেশ নিতে সাহায্য করেছিল। তারপর নলকে ঋতুপর্ণের নিকট আশ্রয় নিতে বলে। ঋতুপর্ণ যেহেতু অক্ষহৃদয়পাশা খেলার কৌশল জানতেন, তাই নলকে তিনি পাশাখেলায় দক্ষ হতে সাহায্য করবেন। নল বাহুক নাম ধারণ করে ঋতুপর্ণের প্রধান সারথি নিযুক্ত হলেন।

দময়ন্তী নলকে অন্বেষণ করবার জন্য যেসকল ব্রাহ্মণদের নিযুক্ত করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে পর্ণাদ নামে এক ব্রাহ্মণ দময়ন্তীকে জানায় যে, সে অযোধ্যায় রাজা ঋতুপর্ণের প্রধান সারথি বাহুকের সাথে কথা বলেছে। বাহুকের দৈহিক আকৃতি ও কথাবার্তা শুনে দময়ন্তী সন্দেহ করে যে, বাহুক-ই নল। অতঃপর দময়ন্তী সুদেব নামক এক ব্রাহ্মণকে পাঠান ঋতুপর্ণের সভায়।

সুদেব ঋতুপর্ণকে জানায় যে, দময়ন্তীর স্বয়ম্বর সভা অনুষ্ঠিত হবে একদিন পরেই। ঋতুপর্ণ স্বয়ম্বরে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক হলেন। প্রধান সারথি নলবাহুক-কে নিয়ে তখনই রওনা দিলেন। পথের মধ্যে একটি ঘটনায় ঋতুপর্ণের গণনার পারদর্শিতার বিষয় প্রকাশ পায়। এরপরই নলরূপী বাহুক নিজের অশ্বচালনার ক্ষমতার বিনিময়ে রাজার থেকে পাশাখেলার শিক্ষা এবং গণনা ক্ষমতা লাভ করেন। এরপর নল কলির প্রভাব থেকে মুক্ত হলো।

বিদর্ভে পৌঁছে ঋতুপর্ণ দেখলেন, সেখানে স্বয়ম্বরের কোনো আয়োজন-ই হয়নি। এতে ঋতুপর্ণ অপ্রস্তুত হলেন, এবং বিদর্ভরাজের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের অযুহাত দিয়ে মুখরক্ষা করলেন। অতঃপর নল ও দময়ন্তীর মিলন হলো। এবং নল ও ঋতুপর্ণ সারাজীবন পরস্পরের বন্ধু হয়ে রইলেন।

একথা স্বীকার করতেই হবে যে, নল-দময়ন্তীর মিলনে রাজা ঋতুপর্ণের ভূমিকা সত্যি-ই অনস্বীকার্য।