Back

ⓘ কার্তবীর্যার্জুন




কার্তবীর্যার্জুন
                                     

ⓘ কার্তবীর্যার্জুন

হৈহেয়রাজ কৃতবীর্যের পুত্র অর্জুন। কৃতবীর্যের পুত্র বলে তাঁর নাম কার্তবীর্যার্জুন।

কার্তবীর্যার্জুন নর্মদা নদীর তীরে মাহিষ্মতী নগরে রাজত্ব করতেন। ঋষি দত্তাত্রেয়-র আশীর্বাদে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে সহস্রবাহু হওয়ার বরলাভ করেন,তাই তাঁর অপর নাম সহস্রবাহু। তাঁর সম্পর্কে একটি শ্লোক গীত হয়ে থাকে যথা-বহুতর যজ্ঞ, বহুতর দান,অনন্ত তপস্যা,বিনয় বা ইন্দ্রিয় সংযম দ্বারা কেউ তাঁর সমকক্ষ হতে পারবে না।

নূনং ন কার্তবীর্যস্য গতিং যাস্যন্তি পার্থিবাঃ।

যজ্ঞৈর্দানৈস্তপোর্ভিবা প্রশ্রয়েণ দমেন চ।।

অনষ্টদ্রব্যতা চ তস্য রাজ্যভবেৎ।।

মহাভারতে বলা হয়েছে কার্তবীর্যার্জুন কঠোর তপস্যার বলে সম্রাট বলে অভিহিত হন। তপস্যা, যোগ ও নিয়ম অবলম্বন করে তিনি প্রজাপালন করতেন এবং তাদের সকল বিপদ হতে রক্ষা করতেন। মহাভারতে কার্তবীর্যার্জুনের নাম ভীমসেনপাণ্ডব নয়, পৃথু ও নহুষের ন্যায় শ্রেষ্ঠ রাজাদের সঙ্গে একসঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে।

                                     

1. বংশ পরিচয়

মহারাজ যযাতির প্রথম পুত্র যদু। যদুর চার পুত্র-সহস্রজিৎ, ক্রোষ্টা, নল ও রঘু। সহস্রজিতের পুত্র শতজিৎ। শতজিতের তিন পুত্র-হৈহয়, হেহয়, বেণুহয়। হৈহয় এর পুত্র ধর্মনেত্র, ধর্মনেত্র-র পুত্র কুন্তি, কুন্তি-র পুত্র সাহজিসংহত। সাহজি-র পুত্র মহিষ্মান। মহিষ্মান-র পুত্র ভদ্রশ্রেণ্যরুদ্রশ্রেণ্য।ভদ্রশ্রেণ্য-র পুত্র দুর্দম। দুর্দম-র পুত্র ধনককনক।ধনকের চারজন বিখ্যাত পুত্র ছিলেন-কৃতবীর্য, কৃতাগ্নি, কৃতবর্মা, কৃতৌজাঃ। এই কৃতবীর্যের পুত্র হলেন কার্তবীর্যার্জুন।

                                     

2. দত্তাত্রেয়-র নিকট বরলাভ

কার্তবীর্যার্জুন দশ হাজার বছর বিষ্ণুর অংশে অবতীর্ণ দত্তাত্রেয় মুনির আরাধনা করে তিনটি বর লাভ করেন।প্রথম বরে-সৈন্যমধ্যে সহস্রবাহু ও অন্য সময়ে দ্বিবাহু হওয়ার ক্ষমতা, দ্বিতীয় বরে-আপন পরাক্রমে সমগ্র পৃথিবী জয় করবার শক্তি এবং তৃতীয় বরে-ধর্মানুসারে রাজ্যশাসন ও প্রজাপালন করবাবর লাভ করেন। এই তিনটি বর লাভ করবাপর তিনি চতুর্থ বর হিসেবে-উদ্ধত না হয়ে ওঠা এবং প্রয়োজনে সজ্জনেরা তাকে শাসন করবে, এই বর চান। দত্তাত্রেয় মুনি খুশি মনে এই বর ও দেন।অতঃপর কার্তবীর্যার্জুন ধৈর্য,বীর্য,যশ,শৌর্য,বিক্রম ও তেজে নিজেকে শ্রেষ্ঠজ্ঞান করেন। তিনি ক্ষত্রিয়কুলের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন।তখন দেবতা বায়ু তাঁকে নানা ধরনের উপদেশ ও কাহিনী বর্ণনা করে তাঁর ধারণা ভ্রান্ত প্রমানিত করেন। বলা-বাহুল্য বায়ু দেবতার উপদেশে তিনি নিজেকে সংশোধন করেননি।

                                     

3. রাবণ ও কার্তবীর্যার্জুন

রামায়ণের উত্তরকাণ্ডে রাবণ ও কার্তবীর্যার্জুন এর যুদ্ধের বিবরণ দেওয়া হয়েছে।

একদিন রাবণ যুদ্ধ-আকাঙ্খায় মাহিষ্মতী নগরেযেখানে অগ্নিদেব বিরাজ করেন উপস্থিত হন। তখন হৈহয়পতি কার্তবীর্যার্জুন তাঁর স্ত্রীদের নিয়ে মাহিষ্মতীর পার্শ্ববর্তী নর্মদা নদীতে জল-বিহার করছিলেন। রাবণ কার্তবীর্যার্জুনকে যুদ্ধের জন্য আহ্বান করেন, কিন্তু কার্তবীর্যার্জুনের মন্ত্রীরা রাবণকে নিরস্ত হতে বলেন, কেননা রাজা বিহার করছেন।তখন রাবণ মাহিষ্মতীর অপরূপ শোভা এবং বিন্ধ্যপর্বত দর্শন করে নর্মদার জলে নেমে মহাদেবের উদ্দেশ্যে পুষ্পাঞ্জলি প্রদান করলেন।রাবণের বিশ্বস্ত মন্ত্রী ও পুত্রগণ-মহোদর, মহাপার্শ্ব, মারীচ, শুক, সারণ, ধুম্রাক্ষ ও প্রহস্ত রাবণকে অনুসরণ করছিলেন।যে স্থানে রাবণ মহেশ্বরের অর্চনা করছিলেন,তার অনতিদূরে সহস্রবাহু অর্জুন জলকেলি করছিল।তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন সহস্র স্ত্রী-হাতির মধ্যে একটি বিশালাকায় পুরুষ হাতি।নিজের শারীরিক ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য তাঁর সহস্রবাহু দিয়ে নর্মদার স্রোতের গতিবেগ রোধ করলেন।নর্মদার সেই জল সহস্রবাহুর বাহুদ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়ে বিপরীত দিকে ধাবিত হলো। সেই বিপরীত স্রোতের কারণে রাবণ প্রদত্ত শিবার্চনার পুষ্প নর্মদার জলে ভেসে গেল। তখন রাবণ শুক ও সারণকে পাঠালেন বিপরীতমুখী স্রোতের উৎস অনুসন্ধান করতে। তারপর শুক-সারণ প্রকৃত ব্যাপার টা রাবণকে জানালে, রাবণ তৎক্ষণাৎ যুদ্ধের অভিলাষে কার্তবীর্যার্জুনের মন্ত্রীদের কাছে গিয়ে তাদের রাজাকে খবর দিতে বলে।কিন্তু মন্ত্রীরা খবর দিতে না চাওয়ায় ক্রোধের বশে রাবণ তাদের সবাইকে হত্যা করে। এই সংবাদ পেয়ে সহস্রবাহু অর্জুন রাবণের সেনাবাহিনীর উপর ভীষণ আক্রমণ করলেন। তাঁর বিশাল গদার আঘাতে রাক্ষসসৈন্য পর্যুদস্ত হলো।প্রহস্ত আহত হলো। রাক্ষসেরা পালাতে লাগল। এরপর রাবণের সাথে কার্তবীর্যার্জুনের তুমুল যুদ্ধ হলো। অবশেষে সহস্রবাহু গদার সাহায্যে রাবণকে পরাজিত ও বন্দী করে মাহিষ্মতী নগরে নিয়ে এলেন।

এদিকে স্বর্গে মহর্ষি পুলস্ত্য তার নাতি রাবণের পরাজয়ের সংবাদ পেয়ে ত্বরিত মাহিষ্মতী নগরে এলেন। সেই উদীয়মান সূর্যের ন্যায় ঋষিকে দেখে কার্তবীর্যার্জুন তাঁকে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। এবং মহর্ষির আগুনের কারণ জানতে চাইলেন। ঋষি কার্তবীর্যার্জুনের কাছে রাবণের মুক্তি প্রার্থনা করলে সহস্রবাহু তৎক্ষণাৎ রাবণকে মুক্তি প্রদান করলেন,এবং রাবণকে উপহার প্রদান করে তাঁর সঙ্গে মিত্রতায় আবদ্ধ হলেন।

এই কাহিনীর শেষে মহর্ষি অগস্ত্য রামচন্দ্রকে একটি নীতিকথা শোনান-হে রঘুনন্দন,বলবান ব্যক্তি অপেক্ষাও এইরূপ অনেক বলবান ব্যক্তি আছেন, যদি নিজের মঙ্গল কামনা কর,তবে মানুষের প্রতি অবজ্ঞা করো না।

এবং বলিভ্যো বলিনঃ সন্তি রাঘবনন্দন।

নাবজ্ঞা হি পরে কার্য্যা যদিচ্ছেঃ শ্রেয় আত্মন।।



                                     

4. পরশুরাম ও কার্তবীর্যার্জুন

মহাভারতের বনপর্বে পরশুরাম ও কার্তবীর্যার্জুনের সংঘর্ষের বর্ণনা রয়েছে।

হৈহেয়রাজ কার্তবীর্যার্জুন মহর্ষি দত্তাত্রেয়-র হতে স্বর্ণময় বিমান লাভ করেন। সেই বিমান সমস্ত ভূমণ্ডল ভ্রমণের উপযোগী ছিল। বলবান সহস্রবাহু সেই বিমানে চড়ে সকলদিকের দেবতা,যক্ষ ও ঋষিদের উপর অত্যাচার করতেন। এবং সেই সকল স্থানের প্রাণীরা তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়েছিল। তখন সেই সকল দেবতা-ঋষিরা ভগবান বিষ্ণুর কাছে গিয়ে কার্তবীর্যার্জুনের প্রতিকারের জন্য প্রার্থনা করলেন। কার্তবীর্যার্জুন শচীপতি ইন্দ্রকে-ও দলিত করেছিল,তাই বিষ্ণু ইন্দ্রের সঙ্গে পরামর্শ করে সহস্রবাহুকে বিনাশ করবার উপায় বের করলেন।

বলবান সহস্রবাহু নিজ শক্তি ও সামর্থ্যের গর্বে এমন উন্মত্ত ছিলেন যে, কোনো কারণ ছাড়াই যুদ্ধ করে অন্যদের কষ্ট দিতেন। একদিন, নিজের পরাক্রম দেখানো জন্য বিনা কারণে তীর মেরে সমুদ্র দেবতাকে উৎপীড়ন করছিলেন। সমুদ্রদেব কার্তবীর্যার্জুনের কাছে এমন আচরণের কারণ জানতে চাইলে, সহস্রবাহু নিজের ক্ষমতার দম্ভ প্রকাশ করেন। তখন সমুদ্রদেব সহস্রবাহুর কাছে জামদগ্ন্য পরশুরামের কথা বললেন।

একদিন পরশুরাম ও তাঁর অন্যান্য ভ্রাতারা ফল সংগ্রহের জন্য বনে গেলেন,তখন যুদ্ধন্মত্ত কার্তবীর্যার্জুন সেই খানে এলেন। তখন পরশুরামের মা রেণুকাদেবী রাজাকে যথাযথ সেবা করলেন,কিন্তু রাজা তাতে সন্তুষ্ট হলেন না। তিনি আশ্রমে যথেচ্ছ উৎপীড়ন করে আশ্রমের হোমধেনুর বৎসকে হরণ করে তাঁর নগরী উদ্দেশ্যে প্রস্থান করলেন। তারপর পরশুরাম ফল-সংগ্রহ করে আশ্রমে ফিরে পিতার মুখে এই দুর্দ্দশার বৃত্তান্ত শুনলেন।এবং সেই হোমধেনুর আর্তনাদ শুনে পরশুরাম অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন।

ক্রুদ্ধ পরশুরাম কার্তবীর্যার্জুনের হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁর দিকে অগ্রসর হন। পরশুরাম ও কার্তবীর্যার্জুনের মধ্যে প্রবল যুদ্ধ হয়,অবশেষে পরশুরাম তীক্ষ্ণ ভল্লবল্লম দ্বারা কার্তবীর্যার্জুনের সহস্রবাহু ছেদন করে তাকে হত্যা করেন।

মহাভারতে বলা হয়েছে পরশুরাম ও কার্তবীর্যার্জুনের যুদ্ধ হয়েছিল পথের মধ্যে,কিন্তু ভাগবত পুরাণে বলা হয়েছে সেই যুদ্ধ হয়েছিল মাহিষ্মতী নগরে।

কার্তবীর্যার্জুনের মৃত্যুতে তার পুত্ররা প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে জমদগ্নির আশ্রমে গিয়ে ঋষিকে হত্যা করে। এই ঘটনায় ক্রোধিত হয়ে পরশুরাম কার্তবীর্যার্জুনের পুত্রদের এবং সেই সাথে হৈহেয়দের ও বিনাশ করেন।

কার্তবীর্যার্জুনের মৃত্যুতে তাঁর পক্ষের ক্ষত্রিয় যোদ্ধারা পরশুরামের ভয়ে পীড়িত হয়ে পলায়ন করেছিল।তাঁরা পরশুরামের ভয়ে স্বজাতির শ্রাদ্ধ-তর্পণ অনুষ্ঠান করতে পারেন নি। ফলে সেইসব ক্ষত্রিয় যোদ্ধারা স্বধর্মচ্যুত হয়ে শূদ্রে পরিনত হয়।

                                     

5. মৎস্যপুরাণের বিবরণ

একদিন সূর্যদেব ব্রাহ্মণের রূপে তাঁর সামনে আবির্ভূত হন। কার্তবীর্যার্জুন তাঁকে যথাবিহিত সম্মান প্রদান করে তাঁকে ভোজন করানোর ইচ্ছা পোষণ করেন। তখন সূর্যদেব সমস্ত স্থাবর পদার্থ ভোজন করবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু কার্তবীর্যার্জুন সেই ভোজন করানোয় অসমর্থ হওয়ায়, তিনি সূর্যদেবের স্তব করেন। সূর্যদেব প্রসন্ন হয়ে সহস্রবাহুকে অক্ষয় শর প্রদান করেন। সেই শর দ্বারা কার্তবীর্যার্জুন চারদিক দগ্ধ করেন। সেই সময় ঋষি আপব জলের তলায় তপস্যা করছিলেন।তাঁর তপস্যা শেষ হয়ে যাওয়ায় জল থেকে উঠে এসে দেখেন যে কার্তবীর্যার্জুনের শরে কুঠির দগ্ধ হয়েছে।তাই দেখে তিনি কার্তবীর্যার্জুনকে কঠিন অভিশাপ দেন।

                                     

6. অন্যান্য

বিষ্ণুপুরাণে

বিষ্ণু পুরাণ মতে কার্তবীর্যার্জুন পঁচাশি হাজার বছর রাজত্ব করেন। তারপর নারায়ণের অংশে-জন্ম পরশুরামের হাতে নিহত হন।তাঁর একশ পুত্র ছিল। তার মধ্যে পাঁচ জন প্রধান।তাঁরা হলেন-শূর,শূরসেন,বৃষণ,মধুধ্বজ,জয়ধ্বজ।এই পাঁচ পুত্র থেকে তালজঙ্ঘ,বীতহোত্র, যদু,বৃষ্ণি প্রভৃতি বংশের সুচনা হয়। অর্থাৎ বিখ্যাত যদু-বৃষ্ণি বংশের পূর্বপুরুষ হলেন কার্তবীর্যার্জুন।