Back

ⓘ প্রদেশ নং ১




প্রদেশ নং ১
                                     

ⓘ প্রদেশ নং ১

প্রদেশ নং ১ নেপালের সাতটি প্রদেশের মধ্যে একটি। ২০১৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর দেশটির নতুন সংবিধান গৃহীত হবার মধ্য দিয়ে নেপালের পূর্বাঞ্চলীয় এ প্রদেশটি গঠিত হয়। প্রাদেশিক রাজধানী বিরাটনগর ছাড়াও প্রদেশটিতে দমক, ধরান, ইটহরী, ইনরুয়া ও বির্তামোডের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহর এবং এভারেস্ট পর্বত, কাঞ্চনজঙ্ঘা, আমা দবলম প্রভৃতি পর্বত রয়েছে। প্রদেশটির পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে নেপালের বৃহত্তম নদী – কোশী। এ প্রদেশ থেকে প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি সভার ২৮ জন এবং প্রাদেশিক সভার ৫৬ জন সদস্য নির্বাচিত হয়ে থাকেন।

প্রদেশটির উত্তরে রয়েছে চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, পূর্বে ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য, দক্ষিণে বিহাআর পশ্চিমে রয়েছে নেপালের বাগমতী প্রদেশ ও প্রদেশ নং ২। ২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী অঞ্চলটিতে প্রায় ৪.৫ মিলিয়ন মানুষ বাস করে এবং সেখানকার জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ১৭৫.৬ জন।

                                     

1. ইতিহাস

রানা রাজবংশের পতনের সময় নেপাল মোট ৩২ টি জেলায় বিভক্ত ছিল। এগুলোর মধ্যে পূর্ব নেপাল বর্তমান প্রদেশ নং ১ এর অন্তর্ভুক্ত জেলাগুলো হচ্ছে:

  • ভোজপুর জেলা পূর্ব নং ৪ ভোজপুর ও খোটাঙ
  • ওখলঢুঙ্গা জেলা পূর্ব নং ৩ ওখলঢুঙ্গা ও সোলুখুম্বু
  • মোরঙ জেলা

১৯৫৬ সালে নেপালের পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলোকে নিয়ে একটি অঞ্চল গঠন করা হয়, যার নাম রাখা হয় অরুণ ক্ষেত্র । অরুণ ক্ষেত্র গঠিত হয়েছিল মোট পাঁচটি জেলার সমন্বয়ে। এর মোট আয়তন ছিল ৭,০০০ বর্গমাইল ১৮,০০০ কিমি ২ এবং জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১১ লক্ষ। অরুণ ক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্ত জেলাগুলো হলো:

  • ভোজপুর জেলা ভোজপুর, খোটাঙ
  • মেচী জেলা ইলাম, ঝাপা
  • বিরাটনগর জেলা সুনসরী, মোরঙ
  • তাপ্লেজুঙ জেলা তাপ্লেজুঙ, পাঁচথর
  • ধনকুটা জেলা ধনকুটা, সঙ্খুয়াসভা

১৯৬২ সালে প্রশাসনিক ব্যবস্থা সংস্কার করে ক্ষেত্র প্রথা বিলুপ্ত করা হয় এবং সমগ্র নেপালকে ৭৫ টি জেলায় বিভক্ত করা হয়। কয়েকটি করে জেলা নিয়ে একেকটি অঞ্চল গঠিত হয়। ১৯৭২ সালে ৩টি অঞ্চল ও ১৬ টি জেলা নিয়ে পূর্বাঞ্চল বিকাস ক্ষেত্র গঠন করা হয়।

২০১৮ সালের ১৭ জানুয়ারি মন্ত্রীসভার বৈঠকে বিরাটনগরকে প্রদেশ নং ১-এর অন্তর্বর্তীকালীন রাজধানী ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৯ সালের ৬ মে প্রাদেশিক পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য বিরাটনগরকেই রাজধানী হিসেবে বহাল রাখার পক্ষে ভোট দেন। ফলে বিরাটনগর স্থায়ীভাবে প্রদেশ নং ১-এর রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

                                     

2. ভূগোল

প্রদেশ নং-১ এর আয়তন ২৫,৯০৫ কিমি ২ । এটি তিনটি ভৌগলিক অঞ্চলে বিভক্ত: উত্তরে হিমালয়, মাঝে পাহাড়ী অঞ্চল এবং দক্ষিণে তরাই অঞ্চল। পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত তরাই অঞ্চল মূলত পলি মাটি দ্বারা গঠিত। কোশী নদীর পশ্চিমে এবং মহাভারত পর্বতশ্রেণি ও শিবালিক পর্বতশ্রেণির মাঝে অবস্থিত উপত্যকাটি ভিতরি তরাই বা দাঙ উপত্যকা নামে পরিচিত। নিম্ন হিমালয় পর্বতশ্রেণী ও শিবালিক পর্বতশ্রেণি সহ বিভিন্ন উচ্চতার পাহাড়, উপত্যকা ও অববাহিকা নিয়ে পাহাড়ী অঞ্চল গঠিত হয়। এই অঞ্চলের কিছু অংশ কৃষি কাজের উপযোগী, আর বাকি অংশ অনুপযোগী। অন্যদিকে, উত্তরের বেশ কিছু পর্বতশ্রেণি নিয়ে গঠিত হয় হিমালয় অঞ্চল। এগুলোর মধ্যে মহালঙ্গুর, কুম্ভকর্ণ, উম্ভেক, লুম্বা সুম্বা, জনক ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। পৃথিবীর উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্ট ৮৮৪৮ মিটার এবং ৩য় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা ৮৫৯৮ মিটার এ প্রদেশেই অবস্থিত।

                                     

2.1. ভূগোল জলবায়ু

প্রদেশ নং ১-এর বিভিন্ন অঞ্চলের জলবায়ুতে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। প্রদেশটি প্রধানত ৩টি ভৌগলিক অঞ্চলে বিভক্ত: তরাইয়ের নিচু ভূমি, পাহাড়ি অঞ্চল এবং হিমালয়ের উঁচু ভূমি।

প্রদেশটির উত্তরাঞ্চলে গ্রীষ্মকাল অপেক্ষাকৃত শীতল এবং শীতকালে প্রচণ্ড শীত থাকে। আর দক্ষিণাঞ্চলে গ্রীষ্মকাল গ্রীষ্মমন্ডলীয় এবং শীতকাল শীতল হয়ে থাকে। জলবায়ুগতভাবে প্রদেশের দক্ষিণাঞ্চল, বিশেষত তারাইয়ে বেশ উষ্ণ এবং আর্দ্র জলবায়ু বিরাজ করে। নেপালের পূর্বাঞ্চলে বছরে প্রায় ২,৫০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। প্রদেশ নং ১-এ পাঁচটি ঋতু রয়েছে: বসন্ত, গ্রীষ্ম, মুনসুন, শরৎ এবং শীতকাল।

                                     

2.2. ভূগোল নদী

এ অঞ্চলে বেশ কিছু নদী রয়েছে। এগুলো হিমালয় থেকে উৎপন্ন হয় এবং দক্ষিণ অভিমুখে বয়ে চলে। কোশী নদী হচ্ছে এ অঞ্চলের প্রধান নদী। সাতটি উপনদী মিলিত হয়ে কোশী নদী গঠন করে বলে একে সপ্তকোশী ও বলা হয়। প্রদেশ নং ১-এর প্রধান নদীগুলো হল:

  • তামাকোশী
  • তমোর নদী
  • মেচী নদী
  • দুধকোশী
  • অরুণ নদী
  • লিখু নদী
  • কোশী নদী সপ্তকোশী এর উপনদীগুলো হল
  • সুনকোশী
  • কঙ্কাই নদী
  • ইন্দ্রাবতী
                                     

2.3. ভূগোল সংরক্ষিত বনাঞ্চল

  • মকালু বরুন রাষ্ট্রীয় নিকুঞ্জ – ১,৫০০ বর্গকিলোমিটার ৫৮০ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে গঠিত একটি জাতীয় উদ্যান
  • সগরমাথা রাষ্ট্রীয় নিকুঞ্জ – ১,১৪৮ বর্গকিলোমিটার ৪৪৩ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে গঠিত একটি জাতীয় উদ্যান
  • গোকিও হ্রদ – ৭,৭৭০ হেক্টর ৩০.০ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে গঠিত
  • মাইপোখরী – ৯০ হেক্টর ২২০ একর এলাকা নিয়ে গঠিত
  • কোশী টপ্পু বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র – ১৭,৫০০ হেক্টর ৬৮ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে গঠিত
  • কোশী টপ্পু বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র– ১৭৫ বর্গকিলোমিটার ৬৮ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে গঠিত একটি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র
  • কাঞ্চনজঙ্ঘা সংরক্ষণ ক্ষেত্র – ২,০৩৫ বর্গকিলোমিটার ৭৮৬ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে গঠিত একটি সংরক্ষিত অঞ্চল
                                     

3. প্রশাসনিক বিভাগ

প্রদেশটিতে মোট ১৩৭টি স্থানীয় প্রশাসনিক একক রয়েছে। এর মধ্যে একটি মহানগরী, ২টি উপ-মহানগরী, ৪৬টি পৌর এলাকা এবং ৪৪টি গ্রামীণ এলাকা গাঁওপালিকা বিদ্যমান।

                                     

4. প্রশাসন

প্রদেশ নং ১-এর প্রাদেশিক পরিষদ – প্রদেশ সভা য় মোট ৯৩টি আসন রয়েছে। এর মধ্যে ৫৬ জন প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে এবং বাকি ৩৭ জন আনুপাতিক হারে নির্বাচিত হন। নেপালের প্রথম প্রাদেশিক নির্বাচন ২০১৭ সালের ২৬ নভেম্বর ও ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

প্রদেশ সভা

২০১৮ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি প্রদেশ সভার প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন ওম প্রকাশ সরবাগী। সে বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি প্রদীপ কুমার ভান্ডারী স্পিকার পদে এবং ১৫ ফেব্রুয়ারি সরস্বতী পোখরেল ডেপুটি স্পিকার পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

                                     

5.1. যোগাযোগ ব্যবস্থা সড়ক পথ

প্রদেশ নং ১-এর প্রায় সব জেলাই সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় সংযুক্ত। তবে, উঁচু এলাকাগুলোর কিছু কিছু রাস্তা এখনো পাঁকা করা হয়নি। বর্ষাকালে এই রাস্তাগুলোর পরিস্থিতি বেশ খারাপ হয়ে যায়। ঝাপা, মোরঙ প্রভৃতি তরাই অঞ্চলের তুলনায় পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে যান চলাচল অনেকটাই কম। প্রদেশ নং ১-এর প্রধান মহাসড়কগুলো হল:

  • মহেন্দ্র মহাসড়ক: নেপালের পূর্ব-পশ্চিম অভিমুখী এই প্রধান মহাসড়কটি প্রদেশের নং ১ এর কাঁকড়ভিট্টা থেকে শুরু হয়েছে।
  • মেচী মহাসড়ক: ২৬৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ২ লেন বিশিষ্ট এই সড়কটি ঝাপা জেলা ও তাপ্লেজুঙ জেলাকে যুক্ত করেছে।
  • কোশী মহাসড়ক: ২ লেন বিশিষ্ট এই রাস্তাটি ১৫৯ কিলোমিটার দীর্ঘ। এটি বিরাটনগর ও ম্যাঙলুঙের মাঝে সংযোগ স্থাপন করেছে।
  • সাগরমাথা মহাসড়ক: ২ লেন বিশিষ্ট ও ২৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মহাসড়ক প্রদেশ নং ২-এর কদমাথা থেকে শুরু হয়ে প্রদেশ নং ১-এর সোলুখুম্বু জেলায় এসে শেষ হয়েছে।
                                     

5.2. যোগাযোগ ব্যবস্থা আকাশ পথ

এ অঞ্চলে অনেকগুলো অভ্যন্তরীণ বিমান পরিবহন সেবা ও বিমানবন্দর রয়েছে। এগুলো হল:

  • তাপ্লেজুঙ বিমানবন্দর, তাপ্লেজুঙ, সঙ্খুয়াসভা জেলা
  • কাংগেল ডাঁডা বিমানবন্দর, কাংগেল, সোলুখুম্বু
  • থামখর্ক বিমানবন্দর, খোটাঙ বাজার
  • রুমজাটার বিমানবন্দর, রুমজাটার, ওখলঢুঙ্গা জেলা
  • ফাপ্লু বিমানবন্দর, ফাপ্লু, সোলুখুম্বু
  • ধরান বিমানবন্দর প্রস্তাবিত
  • স্যাঙবোচে বিমানবন্দর, স্যাঙবোচে, সোলুখুম্বু
  • লামিডাঁডা বিমানবন্দর, লামিডাঁডা, খোটাঙ
  • তুমলিঙ্গটার বিমানবন্দর, তুমলিঙ্গটার, সঙ্খুয়াসভা জেলা
  • ভদ্রপুর বিমানবন্দর, ভদ্রপুর, ঝাপা
  • তেনজিং-হিলারী বিমানবন্দর, লুকলা, সোলুখুম্বু
  • মন মায়া বিমানবন্দর, খোটাঙ
  • বিরাটনগর বিমানবন্দর, বিরাটনগর
  • ভোজপুর বিমানবন্দর, ভোজপুর
                                     

5.3. যোগাযোগ ব্যবস্থা রেলপথ

ভারতীয় রেল নেপালে ১৩ কিলোমিটার রেল লাইন স্থাপন করেছে, যা বাথনাহা রেলওয়ে স্টেশনের সাথে সংযুক্ত। বাথনাহা হচ্ছে ভারতের বিহার রাজ্যের আরারিয়া জেলার একটি গ্রাম। বুধানগর হল নেপালের ফরবেশগঞ্জ–বিরাটনগর অঞ্চলের প্রথম রেল স্টেশন, যা বাথনাহা রেল স্টেশন থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বিরাটনগরকেও এ পথে যুক্ত করার জন্য রেলপথটি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।

                                     

6. জনসংখ্যা

নেপালের ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী প্রদেশ নং ১-এর মোট জনসংখ্যা ৪৫,৪৩,৯৪৩ জন। এর মধ্যে ৫২% অর্থাৎ, ২৩,৬৮,৪০৭ জন নারী। প্রদেশটিতে মোট ৯,৯২,৪৪৫টি পরিবার আছে।

ধর্ম

প্রদেশ নং ১-এর অধিকাংশ অধিবাসী হিন্দু ধর্মাবলম্বী। প্রদেশটির মোট জনসংখ্যার ৬৭% হিন্দু, ১৭% কিরাটি, ৯% বৌদ্ধ, ৪% মুসলিম এবং ১% অন্যান্য ধর্মের অনুসারী।

ভাষা

নেপালি ভাষা প্রদেশটির লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা এবং সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষের মুখের ভাষা। প্রদেশটির প্রায় ৪৩% মানুষ এ ভাষায় কথা বলে। মৈথিলি ভাষায় কথা বলে ১১% অধিবাসী। অন্যান্য ভাষার মধ্যে লিম্বু, তামাং এবং থারু প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

জাতিসত্তা

এই প্রদেশের বৃহত্তম নৃগোষ্ঠী হল ছেত্রী। প্রদেশের মোট জনসংখ্যার ১৫% লোক এ গোষ্ঠীর অন্তর্গত। বাকি জাতিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: বাহুন ১২%, রায় ১১%, লিম্বু ৮% এবং তামাং ৫%। বাকি ১৬% অন্যান্য জাতিভুক্ত।

শিক্ষা

প্রদেশটির ৭১.২২% মানুষ শিক্ষিত অর্থাৎ, লিখতে ও পড়তে সক্ষম।