Back

ⓘ গুরুতর তীব্র শ্বাসযন্ত্রীয় রোগলক্ষণসমষ্টি সৃষ্টিকারী করোনাভাইরাস ২




গুরুতর তীব্র শ্বাসযন্ত্রীয় রোগলক্ষণসমষ্টি সৃষ্টিকারী করোনাভাইরাস ২
                                     

ⓘ গুরুতর তীব্র শ্বাসযন্ত্রীয় রোগলক্ষণসমষ্টি সৃষ্টিকারী করোনাভাইরাস ২

গুরুতর তীব্র শ্বাসযন্ত্রীয় রোগলক্ষণসমষ্টি সৃষ্টিকারী করোনাভাইরাস ২ বা সংক্ষেপে সার্স-কোভ-২, একটি ধনাত্মক দিকমুখী একক-সূত্রবিশিষ্ট আরএনএ ভাইরাস। এটি মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়ে একটি রোগের সৃষ্টি করে, যার নাম করোনাভাইরাস রোগ ২০১৯। এই ভাইরাসঘটিত রোগটি ২০২০ সালে চলমান একটি বৈশ্বিক মহামারীর সৃষ্টি করেছে। ভাইরাসটিকে প্রথমদিকে সাময়িকভাবে "২০১৯ নভেল করোনাভাইরাস" নাম দেওয়া হয়েছিল।

সার্স-কোভ-২ ভাইরাসটির সাথে বাদুড়ের দেহে বাহিত করোনাভাইরাসগুলির ঘনিষ্ঠ বংশাণুগত সাদৃশ্য রয়েছে এবং এগুলির কোনও একটি থেকেই হয়ত বিবর্তনের মাধ্যমে এই ভাইরাসটির উৎপত্তি ঘটেছে। ধারণা করা হচ্ছে একটি অন্তর্বর্তী প্রাণী যেমন আঁশযুক্ত পিপীলিকাভুক বা প্যাঙ্গোলিনের মাধ্যমে মানবদেহে এই ভাইরাস প্রথম প্রবেশ করে। শ্রেণীবিন্যাসীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সার্স-কোভ-২ ভাইরাসটিকে গুরুতর তীব্র শ্বাসযন্ত্রীয় রোগলক্ষণসমষ্টি সৃষ্টিকারী করোনাভাইরাস SARSr-CoV নামক ভাইরাস-প্রজাতির species একটি প্রকার strain হিসেবে শ্রেণীকরণ করা হয়েছে।

এই নতুন প্রকারের করোনাভাইরাসটিকে সর্বপ্রথম মধ্য চীনের হুপেই প্রদেশের উহান নগরীতে শনাক্ত করা হয়। এজন্য কদাচিৎ এটিকে "উহান ভাইরাস", "উহান করোনাভাইরাস" কিংবা "চীনা করোনাভাইরাস" নামেও উল্লেখ করা হতে পারে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সাম্প্রতিককালে ভৌগোলিক অবস্থানের উপর ভিত্তি করে জীবাণুসমূহের নামকরণকে নিরুৎসাহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া সার্স "গুরুতর তীব্র শ্বাসযন্ত্রীয় রোগলক্ষণসমষ্টি", ইংরেজিতে Severe Acute Respiratory Syndrome নামের পুরাতন কিন্তু কাছাকাছি একটি মারাত্মক রোগের সাথে যেন ভুল বোঝাবুঝি না হয়, সে কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের জনস্বাস্থ্যবিষয়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভাইরাসটিকে "কোভিড-১৯ রোগের জন্য দায়ী ভাইরাস" কিংবা "কোভিড-১৯ ভাইরাস" নামগুলি ব্যবহার করছে। সাধারণ জনসাধারণ প্রায়শই এই ভাইরাস ও তার সৃষ্ট সংক্রামক রোগ, উভয়কেই "করোনাভাইরাস" এমনকি আরও সংক্ষেপে "করোনা" বলে ডেকে থাকে, তবে বিজ্ঞানী ও বেশিরভাগ সাংবাদিক সাধারণত বিশেষ পরিভাষা ব্যবহার করেন।

                                     

1. উৎপত্তি ও প্রাদুর্ভাব

জানামতে গুরুতর তীব্র শ্বাসযন্ত্রীয় রোগলক্ষণসমষ্টি সৃষ্টিকারী করোনাভাইরাস ২ সংক্ষেপে ২নং সার্স করোনাভাইরাস নামক ভাইরাসটিকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে চীনের হুপেই প্রদেশের উহান নগরীতে প্রথম শনাক্ত করা হয়। পরে ভাইরাসটি চীনের মূল ভূখণ্ডের অন্যান্য প্রদেশ এবং বহির্গামী বিমানযাত্রীদের মাধ্যমে থাইল্যান্ড, জাপান, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে।

২০২০ সালের ২৭ জানুয়ারির মধ্যে ৪,৫৮৫ জনের সংক্রমণের তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে, যার মধ্যে ৪,৫১৯ জনই চীন ভূখণ্ডের। এখন পর্যন্ত চীনের বাইরের সংক্রমণের ঘটনাগুলো হলেও চীনের সাথে জড়িত অর্থাৎ সংক্রমিত ব্যক্তি হয়তো চীনের উহানে ভ্রমণ করেছেন বা চীন ভ্রমণ করেছেন এমন কোনো কোনও ব্যক্তির সাথে সরাসরি যোগাযোগ করেছিলেন। ২০২০ সালের ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত নভেল করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ছিলো ১০৯। ২০২০ সালের ২০ জানুয়ারি চীনের কুয়াংতুং প্রদেশের গবেষকেরা মানব-থেকে-মানব শরীরে এর বিস্তার হওয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হন।

                                     

2. সার্স-কোভ-২ তথা কোভিড-১৯ করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে করণীয়

করোনাভাইরাস ব্যাধি ২০১৯ কোভিড-১৯ তথা করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে করণীয় বিষয়গুলি নিচে তুলে ধরা হল। এখানে স্মরণীয় যে, করোনাভাইরাস মানুষ-থেকে-মানুষে প্রধানত দুই প্রক্রিয়াতে ছড়াতে পারে। সংক্রমণের প্রথম প্রক্রিয়া টি দুই ধাপে ঘটে। প্রথম ধাপ: করোনাভাইরাস-সংক্রমিত ব্যক্তি ঘরের বাইরে গিয়ে মুখ না ঢেকে হাঁচি-কাশি দিলে করোনাভাইরাস তার আশেপাশের ১-২ মিটার পরিধির মধ্যে বাতাসে কয়েক ঘন্টা ভাসমান থাকতে পারে। দ্বিতীয় ধাপ: সেই করোনাভাইরাস কণাযুক্ত বাতাসে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করলে অন্য ব্যক্তিদের ফুসফুসেও শ্বাসনালি দিয়ে করোনাভাইরাস প্রবেশ করতে পারে। করোনাভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় প্রক্রিয়া টিও কয়েক ধাপে ঘটে। প্রথম ধাপ: করোনাভাইরাস-সংক্রমিত ব্যক্তি যদি কাশি শিষ্টাচার না মানেন, তাহলে তার হাতে বা ব্যবহৃত বস্তুতে করোনাভাইরাস লেগে থাকবে। দ্বিতীয় ধাপ: এখন যদি উক্ত ব্যক্তি তার পরিবেশের কোথাও যেকোনও বস্তুর পৃষ্ঠতলে সেই করোনাভাইরাসযুক্ত হাত দিয়ে স্পর্শ করেন, তাহলে সেই পৃষ্ঠতলে করোনাভাইরাস পরবর্তী একাধিক দিন লেগে থাকতে পারে। তৃতীয় ধাপ: এখন যদি অন্য কোনও ব্যক্তি সেই করোনাভাইরাসযুক্ত পৃষ্ঠ হাত দিয়ে স্পর্শ করে, তাহলে ঐ নতুন ব্যক্তির হাতে করোনাভাইরাস লেগে যাবে। চতুর্থ ধাপ: হাতে লাগলেই করোনাভাইরাস দেহের ভেতরে বা ফুসফুসে সংক্রমিত হতে পারে না, তাই এখন নতুন ব্যক্তিটি যদি তার সদ্য-করোনাভাইরাসযুক্ত হাতটি দিয়ে নাকে, মুখে বা চোখে স্পর্শ, কেবল তখনই করোনাভাইরাস ঐসব এলাকার উন্মুক্ত শ্লেষ্মাঝিল্লি দিয়ে দেহের ভিতরে প্রবেশ করবে ও প্রথমে গলায় ও পরে ফুসফুসে বংশবিস্তার করা শুরু করবে। এজন্য উপরে লিখিত করোনাভাইরাস ছড়ানোর দুইটি প্রক্রিয়ার শুরুতেই এবং কিংবা ছড়ানোর প্রতিটি অন্তর্বর্তী ধাপেই যদি করোনাভাইরাসকে প্রতিহত করা যায়, তাহলে সফলভাবে এই ভাইরাস ও রোগের সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব। এজন্য নিচের পরামর্শগুলি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করা সকলের আবশ্যিক কর্তব্য।

  • রেস্তোরাঁ বা অন্য যেকোনও খাবার বিক্রয়কারী দোকানের থালা-বাসন-বাটি-পাত্র বা বোতল-গেলাস হাত দিয়ে স্পর্শ করা। এইসব তৈজসপত্র বহু ব্যক্তি স্পর্শ করেন এবং এগুলিকে সবসময় সঠিকভাবে জীবাণুমুক্ত করা হয়েছে কি না, তা সম্পূর্ণ নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
  • অন্য কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিগত বস্তু যা হাত দিয়ে ঘনঘন স্পর্শ করা হয়, যেমন মোবাইল ফোন মুঠোফোন, ল্যাপটপ, ইত্যাদি নিজ হাত দিয়ে স্পর্শ করা।
  • নিজ বাসগৃহের বাইরের যেকোনও কামরা বা যানবাহনের দরজার হাতল হাত দিয়ে স্পর্শ করা।
  • কাগজের টাকা, ব্যাংকের ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড, ইত্যাদি এবং এগুলি যেখানে রাখা হয়, যেমন ওয়ালেট বা পার্স ইত্যাদির অভ্যন্তরভাগ হাত দিয়ে স্পর্শ করা।
  • সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা: করোনাভাইরাস কোনও লক্ষণ-উপসর্গ ছাড়াই দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে যেকোনও ব্যক্তির দেহে তার অজান্তেই বিদ্যমান থাকতে পারে। এরকম করোনাভাইরাস বহনকারী ব্যক্তি যদি কোনও কারণে হাঁচি বা কাশি দেন, তাহলে তার আশেপাশের বাতাসে ৩ থেকে ৬ ফুট দূরত্বের মধ্যে করোনাভাইরাসবাহী জলীয় কণা বাতাসে ভাসতে শুরু করে এবং ঐ পরিধির মধ্যে অবস্থিত অন্য যেকোনও ব্যক্তির দেহে স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ভাইরাস প্রবেশ করতে পারে। এ কারণে জনসমাগম বেশি আছে, এরকম এলাকা অতি-আবশ্যক প্রয়োজন না হলে যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে যাতে বাতাসে ভাসমান সম্ভাব্য করোনাভাইরাস কণা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে দেহে প্রবেশ না করতে পারে।
  • ঘরের বাইরে যেকোনও স্থানের হাত মোছার তোয়ালে বা রুমাল যা একাধিক ব্যক্তি স্পর্শ করে, সেগুলিকে হাত দিয়ে স্পর্শ করা।
  • নিজ বাসগৃহের বাইরের যেকোনও আসবাবপত্র হাত দিয়ে স্পর্শ করা।
  • হাত ধুয়ে জীবাণুমুক্তকরণ: পরিবেশে অবস্থিত বিভিন্ন বস্তুতে করোনাভাইরাস লেগে থাকতে পারে, তাই এগুলি কেউ হাত দিয়ে স্পর্শ করলে তার হাতেও করোনাভাইরাস লেগে যেতে পারে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে করোনাভাইরাস কাঠ, প্লাস্টিক বা ধাতুর তৈরি বস্তুর পৃষ্ঠে গড়ে চার থেকে পাঁচ দিন লেগে থাকতে পারে। মানুষকে জীবনযাপনের প্রয়োজনে এগুলিকে প্রতিনিয়তই হাত দিয়ে স্পর্শ করতে হয়। তাই এগুলি স্পর্শ করার পরে হাত ভাল করে ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করা অত্যন্ত জরুরী। নিম্নলিখিত হাত স্পর্শ করার ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রগুলির ব্যাপারে বিশেষ নজর দিতে হবে।
  • ঘরের বাইরে রাস্তায় বা অন্যত্র কারও সাথে করমর্দন করা হাত মেলানো বা কোলাকুলি করা বা ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসা।
  • বহুসংখ্যক ব্যক্তি স্পর্শ করে এমন যন্ত্র, যেমন এটিএম যন্ত্র নগদ টাকা প্রদানকারী যন্ত্র ও অন্য কোনও যন্ত্রের যেমন দোকানের বা অন্য কোনও স্থানের ল্যাপটপ, কম্পিউটারের মনিটর বোতাম, চাবি, কিবোর্ড ও হাতল হাত দিয়ে স্পর্শ করা।

উপরোক্ত ক্ষেত্রগুলিতে হাত দিয়ে স্পর্শের পরে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং যত ঘনঘন সম্ভব হাত ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। নিম্নলিখিত হাত ধোয়ার পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে:

  • এর পর হাতে বিশেষ জীবাণুমুক্তকারক সাবান সম্ভব না হলে সাধারণ সাবান প্রয়োগ করতে হবে ও ফেনা তুলে পুরো হাত ঘষতে হবে।
  • সাবান-পানির ব্যবস্থা না থাকলে কমপক্ষে ৬০% অ্যালকোহলযুক্ত বিশেষ হাত জীবাণুমুক্তকারক দ্রবণ হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত কচলে ধুতে হবে। তবে সুযোগ পেলেই নোংরা হাত সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে নেওয়া সবচেয়ে বেশি উত্তম।
  • যেহেতু দিনে বহুবার হাত ধুতে হবে, তাই ত্বকের জন্য কোমল সাবান ব্যবহার করা শ্রেয়।
  • হাতের প্রতিটি আঙুলে যেন সাবান লাগে, তা নিশ্চিত করতে হবে, এজন্য এক হাতের আঙুলের ফাঁকে আরেক হাতের আঙুল ঢুকিয়ে ঘষে কচলাতে হবে।
  • হাত শুকানোর কাগজের রুমালটি দিয়ে ধরেই পানির কল বন্ধ করতে হবে এবং শৌচাগারের দরজার হাতল খুলতে হবে। পানির কল ও শৌচাগারের দরজার হাতলে ভাইরাস লেগে থাকতে পারে।এরপর কাগজের রুমালটি ঢাকনাযুক্ত বর্জ্যপাত্রে ফেলে দিতে হবে।
  • প্রথমে হাত পরিষ্কার পানিতে ভাল করে ভিজিয়ে নিতে হবে।
  • দুই হাতের বুড়ো আঙুল সাবান দিয়ে ঘষা নিশ্চিত করতে হবে।
  • এক হাতের তালুর সাথে আরেক হাতের তালু ঘষতে হবে এবং এক হাতের তালু দিয়ে আরেক হাতের পিঠও সম্পূর্ণ ঘষতে হবে।
  • পাত্রে রাখা স্থির পানিতে নয়, বরং পড়ন্ত পরিষ্কার পানির ধারাতে হাত রেখে ভাল করে হাত ধুয়ে সম্পূর্ণ সাবানমুক্ত করতে হবে।
  • হাত ধোয়ার পরে তোয়ালে কিংবা রুমাল নয়, বরং একবার ব্যবহার্য কাগজের রুমাল দিয়ে সম্পূর্ণরূপে হাত শুকিয়ে নিতে হবে, কেননা গবেষণায় দেখা গেছে যে ভেজা হাতে ভাইরাস ১০০ গুণ বেশি বংশবিস্তার করে। একাধিক ব্যক্তির ব্যবহৃত তোয়ালে দিয়ে হাত শুকানো যাবে না, এবং একই তোয়ালে দিয়ে বারবার হাত শুকানো যাবে না, তাই একবার-ব্যবহার্য কাগজের রুমাল ব্যতীত অন্য যেকোনও ধরনের তোয়ালে বা রুমাল ব্যবহার করা উচিত নয়।
  • প্রতিটি নখের নিচেও ভালো করে পরিষ্কার করতে হবে।
  • কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড ধরে ফেনা তুলে ভাল করে হাত ঘষতে হবে।
  • ঘড়ি, আংটি বা অন্য যেকোন হাতে পরিধেয় বস্তু খুলে সেগুলির নিচে অবস্থিত পৃষ্ঠও পরিষ্কার করতে হবে।

কখন হাত ধুতে হবে, তা জানার জন্য নিচের নির্দেশনাগুলি মনে রাখা জরুরি:

  • যেকোনো রোগীর সেবা করার আগে, সেবা করার সময়ে বা তার পরে হাত ধুবেন।
  • শৌচকার্য করার পরে হাত ধুবেন।
  • ঘরের বাইরের যেকোনও বস্তুর পৃষ্ঠতল হাত দিয়ে স্পর্শ করার পরে হাত ধুবেন। উপরে হাত স্পর্শ করার ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রগুলি দেখুন
  • হাত যদি দেখতে নোংরা মনে হয়, তাহলে সাথে সাথে হাত ধুবেন।
  • বাসা থেকে কর্মস্থলে পৌঁছাবাপর হাত ধুবেন।
  • হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেন এক রোগী থেকে আরেক রোগী বা অন্য যেকোনো ব্যক্তির দেহে যেন করোনাভাইরাস সংক্রমিত হতে না পারে, সেজন্য সেখানে কর্মরত সমস্ত স্বাস্থ্যকর্মীকে নিম্নের ৫টি মুহূর্তে অবশ্যই হাত ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে: রোগীকে স্পর্শ করার আগে, পরিষ্কারকরণ বা জীবাণুমুক্তকরণ পদ্ধতি প্রয়োগের আগে, রোগীর দেহজ রস বা তরল গায়ে লাগার সম্ভাবনা থাকলে ঠিক তার পরপর, রোগীকে স্পর্শ করাপর এবং রোগীর আশেপাশের পরিবেশ স্পর্শ করার পর।
  • নাক ঝাড়ার পরে, কাশি বা হাঁচি দেবার পরে হাত ধুবেন।
  • বাচ্চাদের ডায়পার বিশেষ জাঙ্গিয়া ধরার পরে বা বাচ্চাদের শৌচকার্যে সাহায্য করার পরে হাত ধোবেন।
  • খাবার আগে ও পরে হাত ধুবেন।
  • যেকোনও জনসমাগমস্থল যার মধ্যে গণপরিবহন, বাজার কিংবা উপাসনাকেন্দ্র অন্তর্ভুক্ত, সেগুলিতে পরিদর্শন করার পরেই হাত ধুবেন।
  • পোষা প্রাণী বা অন্য যে কোনও প্রাণীকে স্পর্শ করার পরে হাত ধুবেন।
  • বর্জ্যপদার্থ ধরার পরে হাত ধুবেন।
  • কর্মস্থল থেকে বাসায় পৌঁছাবাপর হাত ধুবেন।
  • রেস্তোরাঁ, চা ও কফিঘর, দোকানপাট, বাজার, বিপণিবিতান, শপিং মল, ইত্যাদি সমস্ত স্থানে হাঁচি-কাশিতে মুখ ঢাকার জন্য ও ভেজা হাত শুকানোর জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে কাগজের রুমাল বা টিস্যু পেপারের ব্যবস্থা করতে হবে। হাত জীবাণুমুক্তকারক দ্রবণ হ্যান্ড স্যানিটাইজারের এবং/কিংবা সাবান-পানিতে হাত ধোবার ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যবহারেপর কাগজের রুমাল ফেলে দেবার জন্য খোলা নয়, বরং ঢাকনাযুক্ত বর্জ্যপাত্র বা বিনের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • সম্ভব হলে ঘরের বাইরে যাতায়াত বা ভ্রমণের সময় সর্বদা হাত জীবাণুমুক্তকারকের বোতল ও কাগজের রুমাল টিস্যু পেপার সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে হবে।
  • হাত ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করার সুব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ
  • নাক, মুখ ও চোখ হাত দিয়ে স্পর্শ না করা: করোনাভাইরাস কেবলমাত্র নাক, মুখ, চোখের উন্মুক্ত শ্লেষ্মাঝিল্লি দিয়ে দেহে প্রবেশ করতে পারে। পরিবেশে উপস্থিত করোনাভাইরাস স্পর্শের মাধ্যমে হাতে লেগে থাকতে পারে। তাই আধোয়া জীবাণুযুক্ত হাতে কখনোই নাক, মুখ, চোখ স্পর্শ করা যাবে না। যদি একান্তই নাকে মুখে চোখে হাত দিতে হয়, তাহলে অবশ্যই হাত ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করে তা করতে হবে, কিংবা কাগজের রুমাল ব্যবহার করে নাক, মুখ ও চোখ স্পর্শ করতে হবে। এজন্য সবসময় হাতের কাছে সাবান-পানি বা অ্যালকোহলভিত্তিক হস্ত জীবাণুমুক্তকারক কিংবা কাগজের রুমালের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়মটি মেনে চলা অনেকের জন্য কঠিন হতে পারে। নাক, মুখ ও চোখে হাত দেওয়া খুবই সাধারণ ও স্বাভাবিক একটি ঘটনা এবং বহুদিনের অভ্যাসের বশে প্রায় সবাই কারণে-অকারণে এ কাজটি করে থাকে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে মানুষ ঘণ্টায় ২০ বারেরও বেশি মুখের বিভিন্ন অংশে হাত দিয়ে স্পর্শ করে। কিন্তু নিজদেহে করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে হলে এই অভ্যাসের ব্যাপারে অনেক বেশি সচেতন হতে হবে। অনেকে মানসিক চাপের কারণে, গভীর চিন্তা করার সময়, অন্য কোনও অজ্ঞাত মানসিক কারণে কিংবা চুলকানির জন্য নাকে, মুখে, চোখে হাত দিয়ে থাকেন। তাই প্রথমে প্রতিটি ব্যক্তিকে নিজেকে বেশ কিছু সময় ধরে নিয়মিত আত্ম-পর্যবেক্ষণ করে দেখতে হবে কোন কোন সময়ে বা কারণে সে নিজের নাক, চোখ বা মুখে হাত দিচ্ছে। কারণগুলি চিহ্নিত করাপর এবং এগুলি সম্বন্ধে সচেতন হবার পরে একে একে এগুলিকে দূর করার চেষ্টা করতে হবে এবং নাকে,মুখে, চোখে হাত দেয়ার মাত্রা যথাসর্বোচ্চ সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে।
  • গৃহ ও কার্যালয়ে যেসব বস্তু অনেক বহিরাগত মানুষ হাত দিয়ে স্পর্শ করে, যেমন দরজার হাতল, কম্পিউটারের কিবোর্ড ও মনিটরের পর্দা, ল্যাপটপ কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, বা অন্য কোনও বহুল ব্যবহৃত আসবাব, ইত্যাদি নিয়মিতভাবে কিছু সময় পরপর জীবাণুনিরোধক স্প্রে বা দ্রবণ দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে।
  • পরিবেশ পরিষ্কার করে করোনাভাইরাস মুক্তকরণ
  • বাইরে থেকে আসাপর পরিধেয় পোষাক ও অন্যান্য বহুল ব্যবহৃত কাপড় যেমন-বিছানার চাদর, ইত্যাদি নিয়মিত ধুতে হবে।
  • পরিচিত কারও করোনাভাইরাসের লক্ষণ-উপসর্গ দেখা গেলে সাথে সাথে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বা জরুরি ফোনে যোগাযোগ করতে হবে যাতে তাকে দ্রুত পরীক্ষা করা যায় এবং প্রয়োজনে সঙ্গনিরোধ কোয়ারেন্টাইন করে রাখা যায়।
  • রাস্তায় ও যত্রতত্র থুতু ফেলা যাবে না, কেননা থুতু থেকে ভাইরাস ছড়াতে পারে।
  • করোনাভাইরাস-বহনকারী সম্ভাব্য ব্যক্তিদের সম্পর্কে করণীয়
  • হাঁচি-কাশি দেওয়া ব্যক্তিকে অবশ্যই কাশি বা হাঁচি দেওয়ার সময় অস্থায়ী কাগজের রুমাল বা টিস্যুপেপার দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে রাখতে হবে এবং সেই কাগজের রুমাল সাথে সাথে বর্জ্যে ফেলে দিতে হবে। খালি হাত দিয়ে কাশি-হাঁচি ঢাকা যাবে না, কেন না এর ফলে হাতে জীবাণু লেগে যায় হাত দিয়ে হাঁচি-কাশি ঢাকলে সাথে সাথে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে। কাগজের রুমাল না থাকলে কনুইয়ের ভাঁজে বা কাপড়ের হাতার উপরের অংশে মুখ ঢেকে হাঁচি-কাশি দিতে হবে।
  • যে ব্যক্তির জ্বর, সর্দি, কাশি ও হাঁচি হচ্ছে, তার থেকে ন্যূনতম ৩ থেকে ৬ ফুট দূরত্ব বজায় রাখতে হবে, যাতে বাতাসে ভাসমান ভাইরাস কণা শ্বাসগ্রহণের মাধ্যমে দেহে প্রবেশ না করে।
  • রাস্তায় চলাফেরার পথের ধারে উপস্থিত উন্মুক্ত বর্জ্য কিংবা হাসপাতাল ও অন্যত্র উপস্থিত চিকিৎসা বর্জ্যের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে।
  • হাসপাতালে ও অন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীদেরকে অবশ্যই বিশেষ চিকিৎসা মুখোশ ও হাতমোজা পরিধান করতে হবে, যাতে ভাইরাস এক রোগী থেকে আরেক রোগীতে না ছড়ায়।
  • বিবিধ
  • রাস্তায় বা অন্যত্র অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে প্রস্তুতকৃত ও পরিবেশনকৃত খাবার খাওয়া পরিহার করতে হবে, কারণে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে প্রস্তুতকৃত ও অস্বাস্থ্যকর থালা-বাসন-বাটি-পাত্র বা গেলাসে পরিবেশনকৃত খাবার ও পানীয়ের মাধ্যমেও ভাইরাস ছড়াতে পারে।
                                     

3. রোগবিস্তার পদ্ধতি

ইতোমধ্যে জ্ঞাত সার্স রোগের ভাইরাসের বংশাণুসমগ্র অনুক্রমের সাথে খুব বেশি মিল থাকার কারণে ২০১৯ সালের শেষে জনসাধারণের মাঝে যে সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের আবির্ভাব হয় তার৷ বংশাণুসমগ্র অনুক্রমটিও কয়েক সপ্তাহের মাঝেই স্বাস্থ্য গবেষকেরা নির্ণয় করে ফেলেন। প্রথম আক্রান্তের খবর ১৭ই নভেম্বর ২০১৯ তারিখে পাওয়া যায়। চীনের সবগুলো প্রদেশ ছাড়াও এশিয়া, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, ও ওশেনিয়া অঞ্চলের একশটিরও বেশি দেশে জীবাণুটি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা এসব অঞ্চলেই প্রত্যেকটিতেই প্রকটভাবে লক্ষ করা যায়। ২০২০ সালের ৩০শে জানুয়ারি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একে বৈশ্বিক জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কতা এবং ১১ই মার্চ ২০২০ তারিখে করোনাভাইরাস রোগ ২০১৯-কে বৈশ্বিক মহামারী ঘোষণা করে।

২৭ই মার্চ ২০২০ পর্যন্ত ৫,৫৫,৮৭৭ জনের দেহে সার্স-কোভ-২ করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে, যাদের মধ্যে ৮০,০০০ চীনের নাগরিক। তবে এখন আক্রান্তের সংখ্যায় চীনকে পেছনে ফেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষে অবস্থান করছে। সর্বমোট কতজন আক্রান্ত হয়েছে আর কতজনের দেহে ভাইরাসটি শনাক্ত করা গেছে, তার অনুপাত এখনও পরিষ্কার নয়।একটি গাণিতিক অনুমান থেকে দেখানো যায় যে ২৫শে জানুয়ারিতে উহানে আক্রান্ত লোকের সংখ্যা ছিল ৭৫,৮১৫, তখন নিশ্চিতভাবে এর চেয়ে অনেক কম মানুষের দেহে ভাইরাসটির উপস্থিতি নিশ্চিত করা গিয়েছিল। জীবাণুটির কারণে সর্বমোট মৃতের সংখ্যা ২৭ মার্চ ২০২০ তারিখে ২৫,২৩৭ জনে পৌঁছেছে এবং ১,২৮,৭১৭ জন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গিয়েছে।. সর্বমোট মৃতের এক-তৃতীয়াংশ হুপেই প্রদেশের উহান নগরীতে মারা গিয়েছে. ২৪শে ফেব্রুয়ারির আগে যা সর্বমোট মৃতের ৯৫% ছিল। তবে ২৭ই মার্চ তারিখে ইতালিতে মৃতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হয়ে গিয়েছে।

ভাইরাসটির প্রজননের হার R 0 {\displaystyle R_{0}} ১.৪ থেকে ৩.৯ পর্যন্ত ধরা হয়েছে।. অর্থাৎ যদি কোন প্রতিষেধক ব্যবহার না করা হয় বা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ না করা হয় তবে তা একজন ব্যক্তি থেকে ১.৪ থেকে ৩.৯ জনে সংক্রমণ করতে সক্ষম।



                                     

4. প্রতিরোধক টিকার গবেষণা

২০২০ সালের জানুয়ারিতে বেশ কয়েকটি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান প্রকাশিত বংশাণুসমগ্রের জিনোম ভিত্তিতে ২নং তীব্র শ্বাসকষ্টমূলক উপসর্গসমষ্টি-সংশ্লিষ্ট করোনাভাইরাস প্রতিরোধী টিকা তৈরির কাজ শুরু করে।

                                     

5. আরও দেখুন

  • বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারী
  • ভারতে করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারী
  • ২০১৯–২০ করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারী
  • করোনাভাইরাসের রোগ শনাক্তকরণ পরীক্ষা
  • কর্মস্থলে কোভিড-১৯ সংক্রমণ ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা
                                     

6. বহিঃসংযোগ

সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা

  • করোনাভাইরাস কোভিড-১৯ সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় তথ্যাবলি, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট
  • বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা: কোভিড -১৯ প্রশ্ন এবং উত্তর ইংরেজি

উপাত্ত ও মানচিত্র

  • বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক করোনাভাইরাস রোগ কোভিড -২০১৯-এর পরিস্থিতি প্রতিবেদন দেশ অনুযায়ী নিশ্চিত সংক্রামণের অফিসিয়াল সংখ্যা ইংরেজি