Back

ⓘ নানা জোশী




                                     

ⓘ নানা জোশী

পদ্মনাভ গোবিন্দ নানা জোশী তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের গুজরাতের বড়োদরা এলাকায় জন্মগ্রহণকারী ভারতীয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার ছিলেন। ভারত ক্রিকেট দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। ১৯৫১ থেকে ১৯৬০ সময়কালে ভারতের পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশগ্রহণ করেছেন।

ঘরোয়া প্রথম-শ্রেণীর ভারতীয় ক্রিকেটে মহারাষ্ট্র দলের প্রতিনিধিত্ব করেন। দলে তিনি মূলতঃ উইকেট-রক্ষক হিসেবে খেলতেন। এছাড়াও, ডানহাতে নিচেরসারিতে কার্যকরী ব্যাটসম্যান হিসেবে উপস্থাপনায় সচেষ্ট ছিলেন নানা জোশী ।

                                     

1. প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেট

১৯৪৬-৪৭ মৌসুম থেকে ১৯৬৪-৬৫ মৌসুম পর্যন্ত নানা জোশী’র প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন চলমান ছিল। মূলতঃ নিচেরসারির কার্যকরী ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলতেন। তবে, নিজ রাজ্যদলে মহারাষ্ট্রের পক্ষে প্রায়শঃই ব্যাটিং উদ্বোধনে নামতেন তিনি। প্রায় দুই দশকব্যাপী প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবনে নানা জোশী ১৮০টি ডিসমিসালের সাথে স্বীয় নামকে যুক্ত করে রেখেছেন। তন্মধ্যে, ১১৯টি গ্লাভস বন্দী করেছিলেন তিনি।

১৯২৬ সালে গুজরাতের বরোদরা এলাকায় জন্মগ্রহণকারী নানা জোশী মধ্যপ্রদেশ গভর্নরস একাদশের সদস্যরূপে অপরাজিত ১০০ রান তুলে সকলের পাদপ্রদীপে চলে আসেন। ১৯৪৯-৫০ মৌসুমে নাগপুরে সফরকারী কমনওয়েলথ একাদশের বিপক্ষে এ সাফল্য লাভের পাশাপাশি ছয়জন ব্যাটসম্যানকে গ্লাভস হাতে নিয়ে বিদেয় করেন। ফলশ্রুতিতে, একই দলের বিপক্ষে দুইটি অনানুষ্ঠানিক টেস্ট খেলার জন্যে তাকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়।

১৯৫৭-৫৮ মৌসুমের পুনে সামার লীগের একটি খেলায় দশটি ডিসমিসালের ঘটনায় সবকটিতে নিজেকে সংশ্লিষ্ট করেন। পাশাপাশি দলের সংগৃহীত ১১৭ রানের মধ্যে ৬৮ রান করেছিলেন তিনি। বেশ কয়েক বছর মহারাষ্ট্র দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। নানা জোশী ১৯৬০-৬১ মৌসুম থেকে ১৯৬২-৬৩ মৌসুমে দলের অধিনায়কের দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়াও, মহারাষ্ট্র ক্রিকেট দল নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন তিনি। ১৯৭৪ সালে সাংলিতে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের খেলার জন্যে তাকে মনোনীত করা হয় ও ১২৫০০০ রূপী লাভ করেন। ১৯৫৯-৬০ মৌসুমে গুজরাতের বিপক্ষে নয়জন ব্যাটসম্যানকে ডিসমিসাল করেন ও ভারতীয় রেকর্ডের সমপর্যায়ে নিয়ে যান।

                                     

2. আন্তর্জাতিক ক্রিকেট

এমন এক সময়ে ক্রিকেট খেলায় অংশ নিয়েছিলেন তিনি, যখন ভারত দলে একই মানের তিন থেকে চারজন উইকেট-রক্ষকের প্রাচুর্যতা ছিল। প্রায় দশ বছর টেস্ট খেলায় অংশ নিলেও তিনি মাত্র বারো টেস্ট খেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ লাভ করেছিলেন। পঞ্চাশের দশকের প্রায় সবটুকু সময়ে ভারতীয় দলে স্ট্যাম্পের পিছনে অবস্থানের বিষয়ে প্রায়শই নানা জোশী ও নরেন তামানে’র মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হতে হতো। উইকেট-রক্ষক হিসেবে অংশগ্রহণকারী নানা জোশী তার নিজের দিনে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। পাশাপাশি ছন্দহীন অবস্থায়ও তাকে দেখা যেতো।

সমগ্র খেলোয়াড়ী জীবনে বারোটি টেস্টে অংশগ্রহণ করেছেন নানা জোশী। ২ নভেম্বর, ১৯৫১ তারিখে দিল্লিতে সফরকারী ইংল্যান্ড দলের বিপক্ষে টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে তার। ২ ডিসেম্বর, ১৯৬০ তারিখে মুম্বইয়ে সফরকারী পাকিস্তান দলের বিপক্ষে সর্বশেষ টেস্টে অংশ নেন তিনি। ১৯৫৩ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ১৯৫৯ সালে ইংল্যান্ড গমন করেন। ১৯৫১-৫২ মৌসুমে ইংল্যান্ড, ১৯৫২-৫৩ ও ১৯৬০-৬১ মৌসুমে পাকিস্তান, ১৯৫৮-৫৯ মৌসুমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং ১৯৫৯-৬০ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নিজ দেশে অংশগ্রহণের সুযোগ ঘটেছিল তার।

১৯৫১-৫২ মৌসুমে ইংল্যান্ড দল ভারত গমনে আসে। দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা মাঠে সিরিজের প্রথম টেস্টে নানা জোশী’র টেস্ট অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। প্রথম ইনিংসে দুইটি কট ও দুইটি স্ট্যাম্পিং দূর্দান্তভাবে করেন। এটিই খেলায় তার সেরা ব্যক্তিগত সাফল্য ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে তার অমার্জনীয় ভুলের কারণে ইংল্যান্ড দল খেলাটিকে রক্ষা করে।

দ্বিতীয় টেস্টে মাধব মন্ত্রীকে নানা জোশী’র স্থলাভিষিক্ত করা হয়। এরপর তৃতীয় টেস্টে এ স্থানটি প্রবীর সেনের অনুকূলে চলে যায়। চতুর্থ টেস্টে পুণরায় নানা জোশীকে ফিরিয়ে আনা হয়। সিরিজের পঞ্চম ও চূড়ান্ত টেস্টে প্রবীর সেনকে পুণরায় নিয়ে আসা হয় ও পাঁচজন ব্যাটসম্যানকে স্ট্যাম্পিং করেন। এরফলে, ১৯৫২ সালে ইংল্যান্ড গমনার্থে ভারত দলের খেলোয়াড়দের তালিকা থেকে তাকে বাইরে রাখা হয়।

                                     

3. ওয়েস্ট ইন্ডিজ গমন

১৯৫২-৫৩ মৌসুমে ভারত দল ওয়েস্ট ইন্ডিজ গমন করে। দলের অন্যতম সদস্যরূপে সেখানে তিনি চার টেস্টে অংশ নেন। বিনু মানকড় আহত হলে কুইন্স পার্ক ওভাল টেস্টে তিনি ব্যাটিং উদ্বোধনে নামেন। মাধব আপ্তে’র সাথে ৫৫ রানের জুটি গড়েন ও নিজে করেন ৩২ রান। এরপর ১৯৫৯ সালে ইংল্যান্ড সফরে তিন টেস্ট খেলেছিলেন তিনি।

১৯৬০-৬১ মৌসুমে আবারও ভারত দলের পক্ষে খেলার জন্যে মনোনীত হন। বোম্বের ব্রাবোর্ন স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলেন তিনি। এ টেস্টেই তার খেলোয়াড়ী জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। প্রথম দিনের পঞ্চম ওভারে রামকান্ত দেশাইয়ের বলে ১২ রানে থাকা অবস্থায় হানিফ মোহাম্মদের সহজ ক্যাচ ফেলে দেন। এরপর হানিফ মোহাম্মদ ১৬০ রান সংগ্রহ করেছিলেন ও সাঈদ আহমেদের সেঞ্চুরির কল্যাণে পাকিস্তান দল বেশ এগিয়ে যায়। ভারত দলের সংগ্রহ ৩০০/৮ থাকা অবস্থায় খেলার শেষদিকে নানা জোশী ও রামকান্ত দেশাই যথাক্রমে অপরাজিত ৫২ ও ৮৫ রান করে দলকে ৪৫০-এ নিয়ে যান। এটিই তার খেলোয়াড়ী জীবনের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ সংগ্রহ ছিল। এ পর্যায়ে রামকান্ত দেশাইয়ের সাথে নবম উইকেট জুটিতে ১৪৯ রান সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। ঐ সংগ্রহটি বিশ্বরেকর্ড থেকে মাত্র পাঁচ রান দূরে ছিল ও তখনো নবম উইকেটে ভারতীয় রেকর্ড হিসেবে চিত্রিত হয়েছিল। কিন্তু, দল নির্বাচকমণ্ডলী তাকে ক্ষমা করেননি ও আর তাকে কোন টেস্টে অংশগ্রহণের সুযোগ দেননি।

ইনিংস ঘোষণা করা হলে নিশ্চিত ড্রয়ের দিকে যাওয়া খেলায় প্রথম ইনিংসের সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী হানিফ মোহাম্মদকে রামকান্ত দেশাই প্রথম বলেই শূন্য রানে বিদেয় করেন। ক্যাচ ফেলে দেয়া প্রসঙ্গে বিজয় হাজারে মন্তব্য করেন যে, ‘যদি কোন ক্যাচ ক্ষতি করে বা সিরিজের ফলাফল নির্ধারণ করে তাহলে এটি অন্যতম।’



                                     

4. মূল্যায়ন

১৯৮৫ সালে এন এস রামস্বামী নানা জোশী সম্পর্কে মূল্যায়ন করেছিলেন যে, ‘তিনি সপ্রতিভ ও পরিচ্ছন্ন খেলোয়াড় ছিলেন। ওভারেপর ওভার তিনি উইকেটের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে অবিরাম ছুটে চলেছেন। গ্লাভস হাতে বল নেয়া অবস্থায় ফ্যাশন সচেতন ভদ্রমহিলার ন্যায় তাকে দেখাতো।’ তবে, তার ইচ্ছে অনুযায়ী সমসাময়িক উইকেট-রক্ষকদের তুলনায় নিচেরসারিতে ব্যাট হাতে মাঠে নামতেন। প্রবীর সেন ও মাধব মন্ত্রী শীর্ষসারিতে নামতেন। নরেন তামানে’পর নানা জোশী ব্যাটিং করতেন।

                                     

5. ব্যক্তিগত জীবন

আট বছর বয়সে নানা জোশী’র পিতা মৃত্যুবরণ করেন। কিশোর জোশী ও তার ভাইকে নিয়ে তার মাতা পুনে চলে যান ও সেখানে অমানুষিক পরিশ্রম করে তাদেরকে বড় করেন। তিনি সেলাইকর্ম করে সংসার চালাতেন ও ছাত্র থাকাকালে তিনি পাত্র পরিষ্কার করতেন। মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষা সমাপণের পূর্ব-পর্যন্ত তিনি তাকে সহায়তা করে গেছেন। ভাবে স্কুলের পড়াশুনো শেষ করে এসপি ভাও কলেজে ভর্তি হন। পুনের ওয়াদিয়া কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রী সম্পন্ন করেন। এরপর, পুনের স্ট্যান্ডার্ড ভ্যাকুয়াম ও হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন।

১৯৮৭ সালে যকৃতের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। অতঃপর ৮ জানুয়ারি, ১৯৮৭ তারিখে ৬০ বছর বয়সে মহারাষ্ট্রের পুনে এলাকায় নানা জোশী’র দেহাবসান ঘটে।