Back

ⓘ আচেহ সালতানাত




আচেহ সালতানাত
                                     

ⓘ আচেহ সালতানাত

আচেহ সালতানাত, সরকারিভাবে আচেহ দারুসসালাম রাজতন্ত্র, ছিল আধুনিক ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশকেন্দ্রিক একটি সালতানাত। ১৬শ ও ১৭শ শতাব্দীতে এটি একটি প্রধান আঞ্চলিক শক্তি ছিল। পরে সালতানাতের ক্রমাবনতি ঘটে। কুতারাজা ছিল এর রাজধানী যা বর্তমান বান্দা আচেহ।

সমৃদ্ধির শিখরে থাকাবস্থায় আচেহ সালতানাতের সাথে জহর সালতানাত ও পর্তুগিজ নিয়ন্ত্রিত মালাক্কার মধ্যে শত্রুতা ছিল। এই দুটি অঞ্চল ছিল মালয় উপদ্বীপে। তিন পক্ষই মালাক্কা প্রণালী এবং স্থানীয় রপ্তানি পণ্য গোল মরিচ ও টিনের বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিতে চেষ্টা চালায়। এক্ষেত্রে পক্ষসমূহ ক্ষেত্রবিশেষে সাফল্য লাভ করে। উল্লেখযোগ্য সামরিক শক্তির পাশাপাশি আচেহর রাজদরবার ইসলামি পান্ডিত্য ও বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে উঠে।

                                     

1. ভিত্তি ও উত্থান

আচেহর প্রাচীন ইতিহাস স্পষ্ট নয়। একটি সূত্র অনুযায়ী চাম জাতি আচেহর প্রতিষ্ঠাতা। আচেহনিজ ভাষা ১০টি আচেহ-চেমিক ভাষার মধ্যে অন্যতম। সেজারাহ মালায়ু অনুযায়ী চাম্পা রাজা শাহ পাউ কুবাহর এক ছেলে ছিলেন শাহ পাউ লিং যিনি ১৪৭১ খ্রিষ্টাব্দে ভিয়েতনামি লি রাজবংশ কর্তৃক রাজধানী বিজয় আক্রমণের সময় পালিয়ে আসেন এবং তিনি পরবর্তীতে আচেহ রাজ্য স্থাপন করেন।

১৫শ শতাব্দীর মধ্যভাগে আচেহর শাসক ইসলাম গ্রহণ করেন। আলি মুগায়াত শাহ সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি উত্তর সুমাত্রায় তার নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের জন্য ১৫২০ খ্রিষ্টাব্দে অভিযান চালান। তার বিজিত অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে দেলি, পেদির ও পাসাই। তিনি আরু আক্রমণ করেছিলেন। তার পুত্র আলাউদ্দিন আল-কাহার মৃত্যু ১৫৭১ দক্ষিণে সুমাত্রায় রাজ্যবিস্তার করেন। তবে তিনি প্রণালী বরাবর বেশি সাফল্য পাননি যদিও তিনি জহর ও মালাক্কা উভয়ের উপর কয়েকবার আক্রমণ চালিয়েছিলেন। তার এসকল অভিযানে উসমানীয় সুলতান প্রথম সুলাইমান লোকবল ও আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেন। উসমানীয় সাম্রাজ্যের তরফ থেকে কুরতুগলু হিজির রেইসের নেতৃত্বে ১৫টি জাহাজ পাঠানো হয়।

১৫৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২১ জুন ডাচ ক্যাপ্টেন কর্নেলিয়াস হুটম্যান ইস্ট ইন্ডিজে প্রথম তিনটি পরিকল্পিত অভিযানের প্রথমটিতে আচেহ আসেন। ক্রূরা তিনমাস যাবত এখানে অবস্থান করে এবং গোলমরিচ ও অন্যান্য মসলা সংগ্রহ করে। ক্রু জন ডেভিস দাবি করেছেন যে এই দলের উপর স্থানীয় নেতারা আক্রমণ করে যার ফলে ৬৮জন নিহত ও আহত হয়। তারা ফিরে আসাপর সুলতান তাদের গোলমরিচ ক্রয় করার অণুমতি দেন। সে বছর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধিরা জন ল্যাঙ্কাস্টারের অধীনে এখানে আসেন। তিনি ১৬০২ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ রাণী প্রথম এলিজাবেথের চিঠি নিয়ে ফিরে আসেন।

আলাউদ্দিন রিয়ায়াত শাহ ইবনে ফিরমান শাহ ১৫৮৯ থেকে ১৬০৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সুলতান ছিলেন। অভ্যন্তরীণ বিরোধ আরেকজন ক্ষমতাশালী সুলতানকে ১৬০৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত উঠে আসতে বাধা প্রদান করে। এসময় ইসকান্দার মুদা ক্ষমতায় আসেন। তিনি সুমাত্রার অধিকাংশ এলাকায় সালতানাতের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মালয় উপদ্বীপের একটি টিন উৎপাদনকারী অঞ্চল পাহাং জয় করেন। তিনি জহরের সুলতানকে তার কর্তৃত্ব মেনে নিতে বাধ্য করেন। তার শাসনামলে তিনি আদাত মেউকুতা আলাম আদাত অর্থ "প্রথা বা "প্রথাগত নিয়ম" নামক আইন প্রণয়ন করেন। ১৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে মালাক্কার বিরুদ্ধে অভিযানের সময় তার শক্তিশালী নৌবহর ধ্বংস হয়। পর্তুগিজ বিবরণ অনুযায়ী পর্তুগিজ ও জহরের সম্মিলিত বাহিনী তার সব জাহাজ ১৯,০০০ সৈনিকসহ ধ্বংস করে দিতে সক্ষম হয়। তবে আচেহর বাহিনী ধ্বংস হয়নি। সে বছর তারা কেদাহ জয় করে এবং এর অনেক নাগরিককে বন্দী করে আচেহ নিয়ে আসা হয়। সুলতানের জামাতা ও পাহাঙের সাবেক রাজপুত্র ইসকান্দার থানি তার উত্তরসুরি হন। তার শাসনামলে আচেহর অভ্যন্তরীণ অবস্থার উন্নতি ও ধর্মীয় ঐক্য দেখা যায়।

সুলতান ইসকান্দার থানির শাসনামলেপর আচেহ কয়েকজন নারী সুলতানা কর্তৃক শাসিত হয়। পার্শ্ববর্তী রাজ্য থেকে বাসিন্দাদের জিম্মি করার আচেহর সাবেক প্রথার কারণে তারা স্বাধীনতার জন্য উদগ্রীব হয়। ফলে আচেহর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং স্থানীয় শাসকরা শক্তিশালী হয়। সুলতান শুধু প্রতীকি প্রধান হয়ে পড়েন। ১৬৮০ এর দশক নাগাদ, পারস্যের একজন পর্যটক উত্তর সুমাত্রাকে "প্রতিটি কোণ একজন পৃথক রাজা বা শাসককে আশ্রয় দিচ্ছে এবং সকল স্থানীয় শাসক স্বাধীনভাবে কাজ করছেন এবং কোনো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে কর দিচ্ছেন না" হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

                                     

2. সংস্কৃতি ও অর্থনীতি

আচেহ নিজেকে পাসাইয়ের উত্তরাধিকারী হিসেবে দেখে যা ছিল দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার প্রথম ইসলামি রাষ্ট্র। একে মক্কার বারান্দা বলা হত এবং এটি ইসলামি পান্ডিত্যের একটি কেন্দ্র হয়ে উঠে। এখানে কুরআন ও অন্যান্য ইসলামি গ্রন্থ মালয় ভাষায় অনুবাদ করা হয়। আচেহর গুরুত্বপূর্ণ পন্ডিতদের মধ্যে রয়েছেন হামজা পানসুরি, শামসউদ্দিন এবং ভারতীয় নুরউদ্দিন আর-রানিরি।

গোলমরিচ, জায়ফল, লবঙ্গ, সুপারি বাদাম রপ্তানির মাধ্যমে আচেহ সম্পদশালী হয়ে উঠে। ১৬১৭ খ্রিষ্টাব্দে একবার এই রাজ্য পাহাং জয় করেছিল। সুদের নিম্ন হার এবং স্বর্ণ মুদ্রার ব্যবহারের কারণে অর্থনীতি মজবুত হয়। ১৭শ শতাব্দীতে রাজনৈতিক প্রতিপত্তি হারিয়ে ফেলাপর আচেহর বাণিজ্যিক গুরুত্ব ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে চলে যায় যারা ১৬৪১ খ্রিষ্টাব্দে মালাক্কায় সফল অবরোধেপর এই অঞ্চলের প্রধান সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে উঠে।

                                     

3. পরবর্তী বছর এবং ডাচদের বিজয়

১৬৯৯ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান বদরুল আলম শরিফ হাসিম জামালউদ্দিন ক্ষমতা লাভ করেন। তিনি প্রায় ৬০ বছর শাসন করেছিলেন। তাপর বেশ কয়েকজন অল্পকাল স্থায়ী শাসক শাসন করেছেন এবং ১৭২৭ খ্রিষ্টাব্দে বুগিনি রাজবংশের সদস্য সুলতান আলাউদ্দিন আহমেদ শাহ ক্ষমতা লাভ করেন। ১৮শ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং ১৯শ শতাব্দীর শুরুর দিকে পেনাঙের প্রথম কাপিতান চিনা কোহ লে হুয়ান আচেহর ইংরেজি ও ফরাসি বলতে পারা সুলতান জওহরউল আলমের সাক্ষাত লাভ করেন। সুলতান কোহকে আচেহ থেকে গোলমরিচ গাছ সংগ্রহ করার এবং পেনাঙে গোলমরিচ চাষ শুরু করার অণুমতি দেন। পরবর্তীতে ১৮১৯ খ্রিষ্টাব্দে আচেহর আঞ্চলিক প্রধানদের বিদ্রোহ দমনের কাজে কোহ সুলতানকে সাহায্য করেন।

১৮২০ এর দশকে আচেহ পৃথিবীতে গোলমরিচের সরবরাহের অর্ধেক উৎপাদন করত। সুলতান টুঙ্কু ইবরাহিম সালতানাতের নিয়ন্ত্রণ কিছু এলাকায় পুনপ্রতিষ্ঠায় সক্ষম হন এবং "গোলমরিচ রাজা"দের উপর নিয়ন্ত্রণ পান। এরা সুলতানের অধীনস্থ ছিল এবং একে অন্যের বিরুদ্ধে লিপ্ত হত। তিনি তার ভাই মুহাম্মদ শাহর শাসনামলে ক্ষমতায় উঠে আসেন। ডাচরা যখন উত্তরে তাদের অবস্থান শক্ত করছিল তখন তিনি দক্ষিণে তার নিয়ন্ত্রণ গড়ে তোলেন।

ডাচদের দূরে রাখার জন্য ব্রিটেন তার নীতিতে পরিবর্তন আনে এবং সুমাত্রার ইঙ্গ-ডাচ সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়। এই সন্ধিতে স্বর্ণ উপকূল এবং উত্তর আচেহতে সমান বাণিজ্য অধিকারের বিনিময়ে ডাচদের পুরো সুমাত্রায় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেয়া হয়। এই সন্ধি ছিল আচেহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার মত। ডাচরা অভিযোগ করে যে আচেহ জলদস্যুতায় উৎসাহ দিচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আচেহ যুদ্ধ ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দে শুরু হয়। ডাচরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলে মাহমুদ শাহ ১৮৭০–১৮৭৪ আন্তর্জাতিক সাহায্যের আবেদন জানান। তবে কেউ সহায়তা করতে ইচ্ছুক ছিল না।

১৮৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ জানুয়রি প্রাসাদ দখল হওয়াপর সুলতান রাজধানী ত্যাগ করে পাহাড়ের দিকে চলে যান। এসময় ডাচরা আচেহকে তাদের অংশ করে নেয়। তিনি এরপর কলেরায় মারা যান। উভয় পক্ষের অনেকে একই কারণে মারা যায়। তবে আচেহর বাসিন্দারা টুনকু ইবরাহিমের এক নাতিকে সুলতান ঘোষণা করে। অবরোধ এড়ানোর জন্য আচেহর বন্দরগুলোর স্থানীয় শাসকরা মৌখিকভাবে ডাচ কর্তৃপক্ষের কর্তৃত্ব স্বীকার করেন তবে তারা প্রতিরোধের জন্য তাদের আয়ের অর্থ প্রদান করেছিলেন।

এই সময়ে আচেহর অনেক রাজনীতিবিদ উসমানীয় সাম্রাজ্যের কাছ থেকে আশ্রয় চান। এসকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, কিন্তু আন্দোলনগুলো পুরো দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় প্রতিরোধ আন্দোলনে অণুপ্রেরণা যোগায়। উত্তর সুমাত্রার স্থানীয় প্রতিরোধ এরপর স্থানীয় নেতা ও ক্ষমতাশালীদের মধ্যে এবং এরপরে ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সুলতানের একজন উপদেষ্টা আবদুর রহমান আল-জাহির স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব নেয়ার জন্য দ্রুত ফিরে আসেন। বিপ্লবী নেতাদের সাথে তার কলহ হয় এবং মক্কায় চলে যাবার বিনিময়ে ডাচদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।

স্থানীয় জনতা ও কলেরার কারণে ডাচরা তাদের উপকূলীয় অবস্থান মজবুত করতে থাকে এবং পুরো দেশে ধীরে ধীরে অবরোধ শুরু করে। জেনারেল ভন পেল এতে নেতৃত্ব দেন। রাজধানী কিছু ক্ষেত্রে রেলপথ দ্বারা যুক্ত দুর্গ দ্বারা ঘেরা ছিল। ১৮৪৪ খ্রিষ্টাব্দে ডাচরা অবস্থা শান্ত করার জন্য বড় প্রচেষ্টা চালায় কিন্তু তা স্তিমিত হয়ে পড়ে এবং এর বিপক্ষে সমালোচনা সৃষ্টি হয়। ১৮৯৮ থেকে ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে ডাচ সেনাবাহিনী চূড়ান্তভাবে সফল হতে সক্ষম হয়। এসময় অধিকৃত অঞ্চলের প্রত্যেক স্থানীয় ক্ষমতাশালীকে "ক্ষুদ্র ঘোষণা" স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয় যাতে ডাচ ঔপনিবেশিকদের সাথে মিত্রতার অঙ্গীকার ছিল। তাদের সহযোগিতার কারণে ডাচরা আচেহতে একটি স্থিতিশীল সরকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান আত্মসমর্পণ করেন। ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে তার নির্বাসনেপর কোনো উত্তরসুরির নাম ঘোষিত হয়নি কিন্তু প্রতিরোধকারীরা ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ প্রতিরোধ চালিয়ে গিয়েছিল।



                                     

4. উৎস

  • J.M. Barwise and N.J. White. A Traveller’s History of Southeast Asia. New York: Interlink Books, 2002.
  • M.C. Ricklefs. A History of Modern Indonesia Since c. 1300, 2nd ed. Stanford: Stanford University Press, 1994.