Back

ⓘ আরাওয়াক




আরাওয়াক
                                     

ⓘ আরাওয়াক

আরাওয়াক রা হল দক্ষিণ আমেরিকার এক আদিবাসী সম্প্রদায়। তারা মূলত দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর উপকূল ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে বসবাস করত। তবে আরাওয়াক শব্দটি সুনির্দিষ্ট ভাবে কোনও একটি বিশেষ আদিবাসী গোষ্ঠীকে বোঝায় না। শব্দটি দ্বারা বিভিন্ন সময় ক্যারিবীয় নানা জাতি, তাইনো ও লোকোনো জাতির মানুষকে অভিহিত করা হয়েছে। কিন্তু এরা সবাই সাধারণভাবে আরাওয়াক ভাষায় বা তার সাথে সম্পর্কযুক্ত কোনও ভাষায় কথা বলত। তা থেকেই এদের এই নাম। শব্দটি দ্বারা বর্তমানে বৃহত্তর অর্থে দক্ষিণ আমেরিকার আদিনাসীদের এক বিরাট জনগোষ্ঠীকেও চিহ্নিত করা হয়ে থাকে, যারা সবাই আরাওয়াক ভাষাগোষ্ঠীরই কোনও না কোনও ভাষায় কথা বলে থাকে ও একটি সাধারণ সংস্কৃতি বহন করে চলে। এদেরকে সাধারণভাবে আরাওয়াক গোত্র নামে অভিহিত করা হয়।

                                     

1. নামের ইতিহাস

কলম্বাসের নেতৃত্বে স্পেনীয়রা পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দশকে যখন প্রথম আমেরিকা মহাদেশে পদার্পণ করে, তখন তারা প্রথমে মূল মহাদেশে আসেনি। বরং প্রথম কিছু বছর তাদের চলাফেরা সীমাবদ্ধ ছিল ক্যারিবীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দ্বীপ, কিউবা, এসপানিওলা, বাহামা, প্রভৃতি অঞ্চলেই। এখানে তারা প্রথম যাদের সংস্পর্শে আসে, তারা হল তাইনো জাতির মানুষ। কিন্তু পরে যখন তারা দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর ভাগে পদার্পণ করে, তখন তারা লোকোনো জাতির সংস্পর্শে আসে। এই দ্বিতীয় জাতিটির ভাষার সাথে স্পেনীয়দের পূর্ব-পরিচিত তাইনোদের ভাষার অনেক মিল ছিল। আর এরা নিজেদের বলতো আরাওয়াক ও তাদের ব্যবহৃত ভাষাকে বলতো আরাওয়াক ভাষা । এর থেকেই পরবর্তীকালে এই ভাষাগোষ্ঠীটিরই নাম দাঁড়ায় আরাওয়াক ও এই ভাষাগোষ্ঠীর সমস্ত মানুষের ক্ষেত্রেও শব্দটি প্রযুক্ত হতে শুরু করে। ১৮৭১ সালে নৃতত্ত্ববিদ ড্যানিয়েল গ্যারিসন ব্রিনটন এই দুই জাতির ব্যবহৃত ভাষার নিকট বৈশিষ্ট্যকে স্মরণ করে প্রস্তাব দেন যে তাইনো ও তাদের প্রতিবেশী বিভিন্ন ক্যারিব জাতির লোকেদের দ্বীপবাসী আরাওয়াক বলে অভিহিত করা হোক। পরবর্তী বিশেষজ্ঞরা তাকে অনুসরণ করেই তাইনো ও ক্যারিব বিভিন্ন জাতিদের বোঝাতে শব্দবন্ধটি ব্যবহার করতে থাকেন ও তাকে ছোট করে শুধুমাত্র আরাওয়াক বলতে থাকেন। ফলে শব্দটি তার সুনির্দিষ্ট অর্থ ক্রমে হারিয়ে ফেলে। যাইহোক, বিংশ শতাব্দীতে বিষয়টি যখন লক্ষ করা হয়, তখন থেকে ক্যারিবীয় দ্বীপবাসী জাতিগুলিকে বোঝাতে তাইনো শব্দটির আবার পুনরুজ্জীবন ঘটানো হয়। ফলে এখন আরাওয়াক শব্দটি মূলত জাতিগত অর্থে মূলভূখণ্ডে বসবাসকারী লোকোনো প্রমূখ জাতিদের বোঝাতেই ব্যবহার করা হয়।

                                     

2. ইতিহাস

আরাওয়াক ভাষাগোষ্ঠীর ভাষাগুলির উদ্ভব যতদূর সম্ভব দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর অংশে বর্তমান ভেনিজুয়েলা ও কলম্বিয়ার ওরিনোকো নদী অববাহিকা অঞ্চলে। পরবর্তীকালে এরা বিশাল এক অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপীয়দের আগমণের সময় এরা দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে বড় ভাষাগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছিল। সমগ্র ওরিনোকো অববাহিকার পাশাপাশি আমাজন নদী অববাহিকা, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ, কিউবা, হাইতি, প্রভৃতি দ্বীপাঞ্চল, এমনকী মধ্য আমেরিকার বেশ কিছু অঞ্চলেও তাদের বসতি স্থাপিত হয়েছিল। আর যে জাতির লোকেরা নিজেদের "আরাওয়াক" বলে দাবি করতো, সেই লোকোনোরা বাস করতো দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর উপকূল বরাবর আজকের গায়ানা, সুরিনাম, ফরাসি গায়ানায় ও ক্যারিবীয় সাগরে আজকের জামাইকা দ্বীপ ও ত্রিনিদাদের কিছু অংশে।

তাইনো জাতির মানুষও প্রায় একই ভাষায় কথা বললেও তাদের কিছুটা পৃথক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল ক্যারিবীয় অঞ্চলের নানা দ্বীপে। কিন্তু এরাও মূলভূমি থেকেই ঐ দ্বীপ অঞ্চলে গিয়ে বসতি স্থাপন করে। তবে মূলভূমিতে ঠিক কোথায় এদের আদি বসতি ছিল, তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক আছে। অনেকে মনে করেন আজকের কলম্বিয়ার আন্দেস পার্বত্য অঞ্চলেই ছিল এদের মূল বাসভূমি, আবার অনেকের মতে এরা আদতে আমাজন উপত্যকার বাসিন্দা। ১৪৯২ সালে কলম্বাসের নেতৃত্বে ইউরোপীয়দের আগমণের সময় এরাই প্রথম তাদের মুখোমুখি হয়। আমেরিকায় ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতারও প্রথম শিকার এই তাইনোরাই, যার ফলে সংঘর্ষ, যুদ্ধ, মহামারী, অত্যাচার, দাসত্ব, অতি পরিশ্রম, কম বয়সী নারীদের একরকম পাইকারিহারে অপহরণ, প্রভৃতির ধাক্কায় খুব কম সময়ের মধ্যেই এদের জনসংখ্যা ভীষণরকম হ্রাস পায়। সুস্থভাবে বাঁচার কোনও উপায় দেখতে না পেয়ে বহুজন আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়। ফলে ১৫০৮ সালেই এসপানিওলা দ্বীপে তাদের জনসংখ্যা ২-৩ লক্ষ থেকে হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ৬০,০০০, ১৫১০ সালে ৪০,০০০ আর ১৫১৮ সালে মাত্র ৭০০০। ১৫৪২ সালের মধ্যেই সমগ্র দ্বীপ থেকেই তাইনোরা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ষোড়শ শতক শেষ হবার আগেই জাতি হিসেবে তাইনোরা হারিয়ে যায় চিরিতরে সমগ্র আমেরিকা মহাদেশ থেকেই।

                                     

3. বর্তমান অবস্থা ও বংশধররা

তাইনোরা আজ আর নেই। তাদের সাথে সাথে পৃথিবী থেকে মুছে গেছে তাদের ভাষাও। কিন্তু রয়ে গেছে তাদের ভাষার কিছু শব্দ - হ্যামক, পট্যাটো, বার্বিকিউ, হ্যারিকেন, ক্যানিবল। শব্দগুলি আজ স্পেনীয়, ফরাসি ও ইংরেজির মাধ্যমে বিশ্বের বহুভাষাতেই প্রবেশ করেছে, এমনকী আমাদের বাংলাতেও এদের অনেকগুলিই আজ ব্যবহৃত হয়। আর রয়ে গেছে তাদের জিন, স্পেনীয় ও আমেরিন্ডিয়ান বাবা-মার সন্তান মেস্তিজোদের রক্তে। ২০০৩ সালে এক মাইটোকোনড্রিয়াল ডিএনএ সমীক্ষায় দেখা গেছে আজকের পুয়ের্তো রিকোর প্রায় ৬২ শতাংশ অধিবাসীই তাদের মায়েদের দিক থেকে সরাসরি তাইনো/আরাওয়াকদের বংশধর। তাদের প্রভাব আজও অনুভূত হয় কিউবা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে চালু বিভিন্ন লোকবিশ্বাস, ধর্মীয় আচার, সংস্কৃতি ও বিশেষ করে সঙ্গীতে।

লোকোনোরা অবশ্য আজও বেঁচে আছে। সংখ্যা অবশ্য তাদের আজ খুবই অল্প। তারা পাশাপাশি আরও নানা স্থানীয় উপজাতীয় মানুষের সাথে মিলে সমগ্র ষোড়শ শতাব্দী জুড়েই স্পেনীয় ঔপনিবেশিকদের সাথে লড়াই করে চলে। স্পেনীয়রা তাদের সে সময় কোনওভাবেই পুরোপুরি বশ মানাতে পারেনি। সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে অবশ্য তারা প্রতিবেশী কারিব জাতি কালিনা ও গায়ানা অঞ্চলে পরে এসে পদার্পণ করা ওলন্দাজ, ইংরেজ ও ফরাসি ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে স্পেনীয়দের সাথেই সহযোগিতা করতে শুরু করে। এরপর থেকে তাদের সাথে ইউরোপীয় বিভিন্ন শক্তির একরকম বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত লোকোনোরা বিভিন্ন ইউরোপীয় শক্তির সাথে এই বাণিজ্যে লাভবানই হয়েছে। কিন্তু এরপর এরাও ঔপনিবেশিকদের হাতে প্রচণ্ডভাবেই অত্যাচারিত হয়। বিংশ শতাব্দীর প্রায় মধ্যভাগ পর্যন্ত তাদের সংখ্যা ক্রমাগতই কমতে থাকে। তবে এরপর এদের সংখ্যায় একটা স্থিতাবস্থা আসে ও কিছু হলেও বর্তমানে এদের জনসংখ্যা এখন আবার বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে ভেনিজুয়েলা, সুরিনাম, গায়ানা ও ফরাসি গায়ানায় প্রায় ১০ হাজার লোকোনো জাতির মানুষ বাস করেন। এইসব অঞ্চলে এদের বংশোদ্ভূত জনসংখ্যা অবশ্য আরও অনেক বেশি।