Back

ⓘ মানিকগঞ্জ জেলা




মানিকগঞ্জ জেলা
                                     

ⓘ মানিকগঞ্জ জেলা

মূলতঃ সংস্কৃত ’মানিক্য’ শব্দ থেকে মানিক শব্দটি এসেছে। মানিক হচ্ছে চুনি পদ্মরাগ। গঞ্জ শব্দটি ফরাসী। মানিকগঞ্জ নামে কোন গ্রাম বা মৌজার অস্তিত্ব নেই। ১৮৪৫ সাল মহুকুমা সৃষ্টির আগে কোন ঐতিহাসিক বিবরণে বা সরকারী নথিপত্রে মানিকগঞ্জ এর নাম পাওয়া যায়নি। কিংবদন্তী রয়েছে যে, অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে মানিক শাহ নামক এক সুফি দরবেশ সিংগাইর উপজেলার মানিকনগর গ্রামে আগমন করেন এবং খানকা প্রতিষ্ঠা করে ইসলাম ধর্ম প্রচার করেন । পরবর্তীকালে তিনি এ খানকা ছেড়ে হরিরামপুর উপজেলায় দরবেশ হায়দার সেখের মাজারে গমন করেন এবং ইছামতি তীরবর্তী জনশূন্য চরাভূমি বর্তমান মানিকনগরে এসে খানকা প্রতিষ্ঠা করেন । এ খানকাকে কেন্দ্র করে এখানে জনবসতি গড়ে উঠে ।

উক্ত জনবসতি মানিক শাহ’র পূণ্য স্মৃতি ধারণ করে হয়েছে মানিকনগর । মানিক শাহ শেষ জীবনে ধামরাইতে অবস্থিত আধ্যাত্নিক গুরুর দরবার শরীফে ফিরে যাবার মানসে পূনরায় দ্বিতীয় খানকা ছেড়ে ধলেশ্বরীর তীরে পৌঁছেন । জায়গাটির নৈসর্গিক দৃশ্য তার পছন্দ হয় । তিনি এখানে খানকা স্থাপন করেন । প্রথম ও দ্বিতীয় খানকার ভক্তবৃন্দও এখানে এসে দীক্ষা নিতো । মানিকশাহর অলৌকিক গুনাবলীর জন্য জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলেই তাকে শ্রদ্ধা করতেন । এমনকি দস্যূ তস্করগণও কোন অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে খানকার ধারে কাছে আসতো না । তাই ভক্তবৃন্দ ছাড়া বণিকগণও এখানে বিশ্রাম নিতো এবং রাত্রি যাপন করত । এভাবেই ধলেশ্বরীর তীরে মানিক শাহ’র খানকাকে কেন্দ্র করে জনবসতি ও মোকাম প্রতিষ্ঠিত হয় । কেউ বলেন দুর্ধর্ষ পাঠান সরদার মানিক ঢালীর নামানুসারে মানিকগঞ্জ নামের উৎপত্তি হয়। আবার কেউ কেউ বলেন নবাব সিরাজ উদ-দৌলার বিশ্বাস ঘাতক মানিক চাঁদের প্রতি ইংরেজদের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ তার নামানুসারে।

                                     

1. অবস্থান ও আয়তন

মানিকগঞ্জ ঢাকা বিভাগের অন্তর্ভুক্ত একটি জেলা। এই জেলার উত্তর সীমান্তে টাঙ্গাইল জেলা, পশ্চিম, পশ্চিম দক্ষিণ, এবং দক্ষিণ সীমান্তে যথাক্রমে যমুনা এবং পদ্মা নদী পাবনা জেলা ও ফরিদপুর জেলা থেকে এ জেলাকে বিচ্ছিন্ন করেছে। পূর্ব, উত্তর পূর্ব এবং পূর্ব দক্ষিণে রয়েছে ঢাকা জেলার যথাক্রমে ধামরাই, সাভার, কেরানীগঞ্জ, দোহার এবং নবাবগঞ্জ উপজেলা । ইহা ২৩°৫২৪৫" উত্তর অক্ষাংশ ও ৯০˚৪১৫" পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত । মানিকগঞ্জ জেলার আয়তন- ১৩৭৮.৯৯ বর্গ কিঃ মিঃ ।

                                     

2. মুক্তিযুদ্ধ

১৯৭১ সালে মানিকগঞ্জ জেলায় মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম চৌধুরী এবং আবদুল মতিন চৌধুরী।

অক্টোবর মাসের ২৯ তারিখে সিংগাইর উপজেলার বলধারা ইউনিয়নের গোলাইডাঙ্গা গ্রামের উত্তর-পশ্চিম কোণে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল পাকিস্তানি অনুপ্রবেশকারী সৈন্যদের বহনকারী বেশ কয়েকটি নৌকা আক্রমণ করে এবং নুরুনি গাঙ্গায় কালীগঙ্গা নদীর খাল একটি ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। ওই যুদ্ধে ২৫ জন পাকসেনা নিহত এবং অনেক আহত হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার তবারক হোসেন লুডু এই অভিযানের নেতৃত্ব দেন, তিনি মুক্তিবাহিনীর লুডু গ্রুপের কমান্ডার ছিলেন। গোলাইডাঙ্গার যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে কেউই নিহত হয়নি, যা মানিকগঞ্জের পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধ। এই যুদ্ধ শেষে মুক্তিযোদ্ধারা যখন অন্যত্র চলে যায় তখন পাক সৈন্যরা আরও সৈন্য নিয়ে এসে গ্রামের আশেপাশের প্রায় ১৬০০ বাড়ি পুড়িয়ে দেয় এবং স্থানীয় ৯৯ জন নিরীহ লোককে হত্যা করে, যাদের বেশিরভাগ ছিলো বয়স্ক পুরুষ, নারী এবং শিশু। লড়াইয়ের পরে ১৩ নভেম্বর সিঙ্গাইর উপজেলা পাক অধিকৃত সেনাবাহিনী থেকে মুক্ত হয়। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন দলগুলি মানিকগঞ্জের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রবেশ করে এবং কয়েকটি যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের পরাজিত করে। ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর ঢাকার দিকে অগ্রসর হওয়া পাক বাহিনীর একটি দল মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার বরুন্ডি গ্রামে প্রবেশ করে, শাহাদাত হোসেন বিশ্বাস বাদলের নেতৃত্বে একদল মুক্তি বাহিনী মুজিব বাহিনী একটি উপযুক্ত জায়গায় তাদের আক্রমণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, এটি বুঝতে পেরে পাক সৈন্যদের দল গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায়। ১৪ই ডিসেম্বর তৎকালীন মানিকগঞ্জ মহকুমা বর্তমানে মানিকগঞ্জ জেলা হানাদার মুক্ত হয়।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অটুট রাখতে ২০১৭ সালে গঠিত হয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড। এই কমান্ডের প্রতিষ্ঠাকালীন আহ্বায়ক সাটুরিয়া উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত আবুল কালাম এর পুত্র শরিফুল ইসলাম ধলা এবং সদস্য সচিব শিবালয় উপজেলার আরুয়া ইউনিয়নের বীর মুক্তিযোদ্ধা ডাঃ জুলমাত আলী মিয়া মুজাফফর এর পুত্র বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ইঞ্জিনিয়ার মামুন চৌধুরী।

                                     

3. অর্থনীতি

এখানে মোট ১৬৬ টি হাট এবং বাজার রয়েছে। মানিকগঞ্জে ৫৪ টি মেলা মেলা অনুষ্ঠিত হয়। "মানিকগঞ্জ বিজয় মেলা" - মানিকগঞ্জ, "বাহাদিয়া বৈশাখী মেলা, বাহাদিয়া" জয়মন্টপ মোধোর মেলা, জয়মন্টপ বাহাদিয়া বাজার "মাঝি বারির মেলা" - দিয়াবাড়ি, "জিন্দা শাহ মেলা" - ঝিটকা, "বেলাল / বিল্লাল পাগলার মেলা "- হারগঞ্জ," রাউথ যাত্রা মেলা "- কাটিগ্রাম," পৌষ মেলা "- আতিগ্রাম," বাথাইমুরি মেলা "- বাথাইমুড়ি," বাহের পাগল মেলা "- বাঙ্গালা," বাহের পাগলার মেলা "- মহাদেবপুর," সাধুর মেলা "- দক্ষিণ জামশা," সাধনোটা মেলা "- মালুচি," আজিজ পাগলার মেলা "- কচিধারা," বরুনি মেলা "- বাটনি বিখ্যাত এবং প্রিয় মানিকগঞ্জ জুড়ে মহাদেবপুর বাজার, বড়ঙ্গাইল বাজার, বৈরা বাজার, ঝিটকা বাজার, জামশা বাজার, দিয়াবাড়ি বাজার, ঘিওর বাজার, সিংগাইর বাজার, বাঙলা বাজার, মালুচি বাজার বল্লা বাজার, ইন্তাজগঞ্জ বাজার, বাটনি বাজার,আমতলী বাজার,দৌলতপুর বাজার,কলিয়া বাজার মানিকগঞ্জের বিখ্যাত বাজার।

                                     

4. প্রশাসনিক এলাকাসমূহ

মানিকগঞ্জ জেলা ৭টি উপজেলার সমন্বয়ে গঠিত; এগুলো হলোঃ

  • শিবালয় উপজেলা,
  • সিঙ্গাইর উপজেলা এবং
  • হরিরামপুর উপজেলা।
  • ঘিওর উপজেলা
  • দৌলতপুর উপজেলা,
  • সাটুরিয়া উপজেলা,
  • মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা,
                                     

5. শিক্ষা

  • মানিকগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ
  • পাটগ্রাম অনাথবন্ধু সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়
  • ইতকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুল
  • তেরশ্রী কালীনারায়ণ ইনষ্টিটিউশন
  • সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ
  • খানবাহাদুর আওলাদ হোসেন খান উচ্চ বিদ্যালয়
  • মানিকগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়
  • শিবালয় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়
  • খানবাহাদুর আওলাদ হোসেন খান ডিগ্রী কলেজ
  • জান্না সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়
  • বেজপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়
  • জয়মন্টপ উচ্চ বিদ্যালয়
  • জান্না আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়
  • দক্ষিণ জামশা উচ্চ বিদ্যালয়
  • রুপসা ওয়াহেদ আলী উচ্চ বিদ্যালয়
  • ঘিওর দুর্গা নারায়ন উচ্চ বিদ্যালয়
  • তেরশ্রী ডিগ্রী কলেজ
                                     

6. উল্লেখযোগ্য স্থান

  • তেওতা জমিদার বাড়ি, শিবালয়ঃ মানিকগঞ্জ উপজেলাধীন শিবালয় উপজেলার তেওতা জমিদার বাড়িটি বাবু হেমশংকর রায় চৌধুরী, বাবু জয় শংকর রায় চৌধুরী পিং দুই সহোদর ভ্রাতার নিজ বসতবাড়ী ছিল। তেওতা অবস্থান করে তারা জমিদারি পরিচালনা করতেন।
  • ধানকোড়া জমিদার বাড়ি
  • নাহার গার্ডেন, কামতা, সাটুরিয়া।
  • মানিকগঞ্জ জেলার আরিচা ঘাট এই এলাকার অন্যতম দর্শনীয় স্থান। যমুনা সেতুর আগে এই ঘাট দিয়েই যানবাহন পারাপার করা হতো।
  • বালিয়াটি প্রাসাদ, মানিকগঞ্জ জেলার পুরাকীর্তির ইতিহাসে বালিয়াটির জমিদারদের অবদান উল্লেখ যোগ্য। বালিয়াটির জমিদারেরা উনিশ শতকের প্রথমার্ধ থেকে আরম্ভ করে বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত প্রায় শতাধিক বছর বহুকীর্তি রেখে গেছেন যা জেলার পুরাকীর্তিকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছে।
                                     

7. বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব

  • খান আতাউর রহমান, সুরকার, গায়ক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, সংগীত পরিচালক, গীতিকার, প্রযোজক।
  • ডঃ দীনেশচন্দ্র সেন, প্রাচীন পুঁথি সংগ্রাহক, সাহিত্যিক, গবেষক।
  • মুনীর চৌধুরী, শহীদ বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, নাট্যকার, সাহিত্য সমালোচক, ভাষাবিজ্ঞানী।
  • কিশোরীলাল রায় চৌধুরী।
  • অমলেন্দু বিশ্বাস বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি যাত্রাপালার পথিকৃত। প্রখ্যাত যাত্রাভিনেতা।
  • সৈয়দ আবুল মকসুদ সাহিত্যিক এবং প্রথম আলোর নিয়মিত কলাম লেখক।
  • হীরালাল সেন, উপমহাদেশের চলচিত্রের জনক, চিত্রগ্রাহক।
  • মমতাজ বেগম, সংগীত শিল্পী, সংসদ সদস্য।
  • শামসুজ্জামান খান, সাবেক মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমি।
  • বিচারপতি এ কে এম নূরুল ইসলাম, বাংলাদেশের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান বিচারপতি।
  • নীনা হামিদ,প্রখ্যাত লোকশিল্পী।
  • ড. অমর্ত্য সেন, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ, দার্শনিক।
  • নাইমুর রহমান দুর্জয়, বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক, সংসদ সদস্য।
  • ফারুক আহমেদ,জনপ্রিয় নাট্যভিনেতা।
  • রফিকউদ্দিন আহমদ, ভাষা শহীদ।
  • খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন, ভাষা সৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সাবেক সংসদ সদস্য, চীফহুইপ। সাবেক মহাসচিব, বিএনপি।
  • হারুনার রশীদ খান মুন্নু, সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী। বাংলাদেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক।
  • মাসুদ আলি খান, অভিনেতা।