Back

ⓘ জগৎকান্ত শীল




                                     

ⓘ জগৎকান্ত শীল

জগৎকান্ত শীল একজন প্রখ্যাত বাঙালী বক্সার ও ক্রীড়াবিদ । ফুটবল, হকি, ক্রিকেট, টেনিস, সাঁতার, দূরপাল্লার দৌড় ইত্যাদিতে জগৎকান্ত সমানভাবে যোগদান করেছিলেন । কিন্তু বক্সিং-এ তার অবদান অনস্বীকার্য । ১৯৪৮ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক এবং ১৯৫২ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে ভারতীয় বক্সিং দলের বিশেষজ্ঞ কোচ হিসাবে যোগদান করেন । শরীরচর্চায় বাঙালীদের বিশেষ উৎসাহদানের জন্য" স্কুল অফ ফিজিক্যাল কালচার”-এর প্রতিষ্ঠা করেন ।।

                                     

1. প্রথম জীবন

মধ্য কলকাতার ১৮ নম্বর সিদ্ধেশ্বর চন্দ্র লেনে বঙ্কুবিহারী শীল এর দ্বিতীয় সন্তান জগৎকান্ত শীল এর জন্ম হয় ১৯০৩ সালে | জগৎকান্তরা ছিলেন চার ভাই ও পাঁচ বোন ।

জগৎকান্ত ছোটবেলা থেকেই খুব দুরন্ত ছিলেন । শারীরিক সক্ষমতা অন্যদের থেকে অনেক বেশি থাকায় তার সঙ্গে অন্য ছেলেরা একা বা একযোগে লড়াই করতে উঠতে পারতো না । এইসময় থেকেই তার মধ্যে যে কোনো রকম খেলাধূলোর প্রতি আগ্রহ বাড়তে লাগলো ।

ছয় বছর বয়সে জগৎকান্ত বৌবাজার হাইস্কুল-এ ভর্তি হন । কিন্তু যথারিতি তিনি পড়াশুনার থেকে খেলাধূলায় বেশি আগ্রহী ছিলেন । থার্ড ক্লাসেএখনকার ক্লাস এইট ওঠাপর ফুটবল খেলার প্রতি আকর্ষণ তাকে স্কুলের একটা দল গঠনে অনুপ্রাণিত করে । তখনকার দিনে বাঙালি পাড়ার কোনো স্কুলে ফুটবল বা অন্য কোনো দল ছিল না । স্কুল কর্তৃপক্ষ বা অভিভাবক কেউই ছাত্রদের দৈহিক অনুশীলনের প্রতি মনোযোগ বা উৎসাহ দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করতেন না - বরঞ্চ এই প্রচেষ্টাকে নিরস্ত করারই চেষ্টা করতেন । জগৎকান্তের নিরলস প্রচেষ্টায় কয়েকজন ছাত্রকে নিয়ে অবশেষে একটা ফুটবল দল গঠন করা হল ।

মাট্রিক পাশ করে তিনি যখন বঙ্গবাসী কলেজএ ভর্তি হলেন তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে এসেছে । জগৎকান্তের কলেজ জীবন ছিল খণস্থায়ী কিন্তু সমস্ত খেলাধূলার প্রতি উৎসাহ তাকে বৃহত্তর ক্রীড়াক্ষেত্রে প্রবেশ করার সুযোগ এনে দিয়েছিল । তিনি মোহনবাগান ক্লাবএখনমোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব এর সভ্য হলেন । প্রথমে ক্লাবের দ্বিতীয় টিমে খেলা শুরু করে কিছুদিনের মধ্যেই প্রথম ডিভিশন লীগ টিমে নিজের স্থান করে নেন । এর সঙ্গে ক্রিকেট এবং দূরপাল্লার দৌড়ে নিজেকে পারদর্শী করে তুলতে লাগলেন । প্রথম বাঙালী প্রতিযোগী হিসেবে প্রথমে পাঁচ মাইল ও পরে দশ মাইল দৌড় প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহণ করা শুরু করেন ।

১৯১৯ থেকে ১৯২৬ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে কঠিন শ্রম ও অধ্যাবসায়ের দ্বারা নিজেকে উচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করেন । ১৯২৩-২৪ সালে মাদ্রাজেচেন্নাই ডাঃ এইচ ডব্লু বাক্‌ - এর অধীনে স্কুল অফ ফিজিক্যাল এডুকেশন থেকে প্রথম শ্রেণীর ডিপ্লোমা নিয়ে সসন্মানে কলকাতায় ফিরে আসেন ।

                                     

2.1. কর্মজীবন চাকরী

খেলাধূলোর প্রতি ছেলের এত উৎসাহ বঙ্কুবিহারীকে চিন্তিত করে তুলেছিল, অনেক বকাবকি করেও যখন লাভ হল না তখন তিনি জোর করে জগৎকান্তকে আন্ড্রু ইউল কোম্পানীর চাকরিতে ঢুকিয়ে দেন যেখানে তিনি নিজেও চাকরি করতেন । তা সত্ত্বেও জগৎকান্ত অফিসের ফাঁকে এবং ফাঁকি দিয়ে পুরোদমে খেলাধূলো চালিয়ে যেতে লাগলেন । কিন্তু এই ব্যাপারটা বেশিদিন চাপা থাকলো না – উপরওয়ালার ধমক খেয়ে বিরক্ত হয়ে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে দিলেন । তারপর কলকাতা কর্পোরেশনএখনকলকাতা পৌরসংস্থার" পার্ক ফিজিক্যাল ডাইরেক্টর” হিসাবে কিছুদিন চাকরি করেন । এরপর তিনি অক্টোভিয়াস স্টীল কোম্পানী, জগবন্ধু ইনস্টিটিউশন, বাটা শ্যু কোম্পানী এবং অবশেষে আবার কলকাতা কর্পোরেশনের চাকরিতে যোগদান করেন যেখান থেকে ১৯৬৭ সালে তার চাকরি জীবন শেষ হয় ।

                                     

2.2. কর্মজীবন ক্রীড়াপারদর্শীতা

মোহনবাগানে ফুটবল খেলা ছাড়াও জগৎকান্ত অন্যান্য খেলাধূলোর সাথেও যুক্ত ছিলেন । এর মধ্যে প্রধান ছিল বক্সিং ও দূরপাল্লার দৌড় । পরাধীন ভারতে কলকাতার সাহেব পাড়ায় ‘নেটিভ’ বাঙ্গালীদের প্রতি গোরা সাহেবদের ঔদ্ধত্য ও দূরব্যবহার জগৎকান্ত কোনোদিনই মেনে নিতে পারেননি । তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন নিজেরা শক্তিশালী হয়ে সাহেবদের মোকাবিলা করবার । তাই তিনি মাদ্রাজে থাকাকালীন ডঃ বাক-এর কাছে নিজেই বক্সিং-এর চর্চা শুরু করেন । ইতিমধ্যে তিনি প্রথম বাঙ্গালী হিসেবে ১০ মাইল দূরপাল্লার দৌড় প্রতিযোগীতায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে বিশেষ কীর্তি স্থাপন করেন । এতকিছু করার পরেও বক্সিং নিয়ে কিছু করতে না পারার দূঃখ জগৎকান্তকে অশান্ত করে তোলে । বক্সিং একা একা অভ্যাস করা যায় না – প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রয়োজন । তাই তিনি আরও দুজন বাঙ্গালী যুবক এবং একজন নেপালী যুবককে অনুপ্রাণিত করে ‘ওয়াই এম সি এ’ কলেজস্ট্রীট শাখায় প্রতিদিন বিকেলে অনুশীলন শুরু করলেন । উপযুক্ত শিক্ষক না থাকায় তাদের অনুশীলনে খামতি থেকে যাচ্ছিল । জগৎকান্ত তৎকালীন দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগের মিস্টার ফিশাএর সঙ্গে এই বিষয়ে যোগাযোগ করেন – যিনি নিজে বক্সার ছিলেন না কিন্তু জগৎকান্তের আগ্রহ দেখে তার পূর্বলব্ধ্ জ্ঞান থেকে এই চার যুবককে শিক্ষা দান করতে লাগলেন ।



                                     

2.3. কর্মজীবন সংগঠক

বক্সিং শেখার মাধ্যমে জগৎকান্তের সাংগঠনিক ক্ষমতার প্রকাশ পায় । ১৯২৫ সালে ইণ্ডিয়ান অ্যামেচার বক্সিং ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারী শ্রী পি মিশ্র, শ্রী বি এন দাস, ডঃ এস মুখার্জী, পি কে সাউ, সন্তোষ দত্ত, এস সি দত্ত প্রমুখের সহযোগিতায়" স্কুল অফ ফিজিক্যাল কালচার”-এর গোড়াপত্তন করেন । সেই বছরই পাঁচ মাইল দৌড় প্রতিযোগিতার প্রথম বার্ষিক অনুষ্ঠান পালন করেন ।" স্কুল অফ ফিজিক্যাল কালচার” বলতে যা বোঝায় প্রথম দিকে তার কিছুই ছিল না । ডঃ বামন দাস মুখোপাধ্যায়ের সহায়তায় ১২৬ নং ধর্মতলা স্ট্রীটের চত্বরে চারটি খুঁটি পুঁতে দু প্রস্ত দড়ি দিয়ে ঘিরে একটি বক্সিং রিং তৈরী হল যা ছিল কলকাতার পুরোদস্তুর বাঙ্গালীদের বক্সিং শিক্ষার কেন্দ্র ।

এই রিং-এ জগৎকান্ত তৎকালীন পশ্চিম ভারতের বক্সার মিলটন কিউবস-কে নিয়ে এসে শিক্ষাদানের বন্দোবস্ত করলেন । প্রাথমিকভাবে স্কুলে ছাত্র যোগাড় করা মুশকিল হয়ে যাচ্ছিল । জগৎকান্ত তখন ডঃ বাকের কাছে শেখা ডাম্বেল ও মুগুর ড্রিল শুরু করলেন । সেখানে বেশ কিছু ছাত্র ভর্তি হল । এই ড্রিলের দল থেকেই জগৎকান্ত তৈরী করলেন তার ছোট বক্সিং দল ।

এইবার তিনি এই দলটির প্রচারের দিকে নজর দিলেন । অ্যাংলো ইণ্ডিয়ান ও ইংরেজদের স্কুল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী যোগাড় করলেন ।" সাহেবদের সঙ্গে বাঙ্গালীদের লড়াই” খুব তাড়াতাড়ি জনপ্রিয়তা লাভ করলো । যেখানে যত জলসা হত জগৎকান্তের ডাক পড়তো । এই রকম প্রদর্শনীতে বক্সিং দেখবার জন্য প্রচুর জনসমাবেশ হত, টিকিটের চাহিদাও ছিল প্রচুর । গ্লোব সিনেমা, এম্পায়ার সিনেমা, কিং কার্নিভাল, মট কার্নিভাল, সেলার্স সার্কাস, রয়্যাল সার্কাস, কারসন সার্কাস ইত্যাদি হলগুলিতে যে সব বক্সিং প্রদর্শনী হত তাতে জগৎকান্ত প্রথম দিকে বাঙ্গালী হিসেবে সুযোগ পেতেন না । কিন্তু প্রতিভাকে কখনোই চেপে রাখা যায় না । ক্রীক রো নিবাসী এক অ্যাংলো ইণ্ডিয়ান মিস্টার লরেন্সের তত্ত্বাবধানে জগৎকান্ত ইংরেজ ও অ্যাংলো ইণ্ডিয়ানদের সাথে বক্সিং প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা শুরু করেন । প্রায় সবকটি লড়াইতেই জগৎকান্ত বিজয়ী হন এবং দিকে দিকে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে" জে কে শীল” হিসেবে । ১৯২৬ থেকে ১৯৩৪ সালের মধ্যে তিনি প্রায় ১৫০টির বেশি লড়াইতে তিনি যোগদান করেন, হারেন মাত্র ১২/১৩টিতে । এর মধ্যে প্রমুখ হল ১৯২৮ সালে কলকাতার পার্ল সিনেমাতে বিখ্যাত বক্সার উইল কার্টার এবং ১৯৩০ সালে আমেরিকান সার্কাসে ফিলিপিও বক্সার রস কার্লোর সাথে লড়াই যেখানে প্রতিক্ষেত্রেই জগৎকান্ত জয়লাভ করেন ।

জগৎকান্ত তার এক অন্যতম অনুরাগী তদনিন্তন কলকাতার মেয়র শ্রী সুভাষচন্দ্র বসুর সহায়তায়" স্কুল অফ ফিজিক্যাল কালচার”-কে ওয়েলিংটন স্কোয়ার পার্কে স্থানান্তরিত করতে সক্ষম হন । সেই বছরই জগৎকান্ত আন্তঃ স্কুল বক্সিং প্রতিযোগিতা শুরু করলেন যেখানে বাংলার বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিযোগীরা যোগদান করতো ।" স্কুল অফ ফিজিক্যাল কালচার”-এ আস্তে আস্তে বক্সিং ছাড়াও অন্যান্য খেলাধুলা যেমন কুস্তি, জিমন্যাসটিক, টেনিস এবং ক্রিকেট খেলার প্রশিক্ষণ শুরু করলেন ।

জগৎকান্ত বাঙ্গালী ছেলেমেয়েদের শরীর শিক্ষায় উৎসাহিত করার জন্য" শরীর সামলাও” নামে একটি বই প্রকাশ করেন ।

                                     

2.4. কর্মজীবন শিক্ষকতা

জগবন্ধু ইনস্টিটিউশন ও কলকাতা কর্পোরেশনে ব্যায়ামশিক্ষক হিসেবে জগৎকান্ত বেশ কিছুদিন কাজ করেন । ব্যায়াম ও মুষ্টিযুদ্ধ ছাড়াও ফুটবল শিক্ষক হিসেবে তার অবদান প্রচুর। ১৯৩৭ সালে এরিয়ান ক্লাব তার কোচিং-এ ডুরাণ্ড কাপের সেমিফাইনালে ওঠে । এর পর বাটা শ্যু কোম্পানীর ফুটবল দল জগৎকান্তের তত্ত্বাবধানে বোম্বে থেকে বিখ্যাত রোর্ভাস কাপ জয় করে নিয়ে আসে । এরপর তিনি ইস্টবেঙ্গল ক্লাবেরবর্তমানে কিংফিশার ইস্টবেঙ্গল ক্লাব কোচ হিসেবে যোগদান করেন । ১৯৪১ সালে তারই তত্ত্বাবধানে ইস্টবেঙ্গল ক্লাব প্রথমবার লীগ খেতাব জয় করে।

                                     

3. বিচারক

বক্সিং ছাড়াও জগৎকান্ত ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, অ্যাথেলেটিকস, সুইমিং, জিমন্যাস্টিক, ওয়েটলিফটিং ইত্যাদিতে নিয়মিতভাবে বিচারকের আসন গ্রহণ করতেন। মৃত্যুকাল অবধি তিনি" বেঙ্গল রোড রেস অ্যাসোসিয়েশন”-এর সভাপতি ও" কলকাতা রেফারিস অ্যাসোসিয়েশন”-এর রেফারিদের পরীক্ষক বোর্ডের সভাপতি ছিলেন । আইএবিএফ অ্যামেচার অ্যাথেলেটিক ফেডারেশন ও অন্যান্য বহু প্রতিষ্ঠানের কার্যকরী সমিতির সভ্য ছিলেন ।

                                     

4. বিদেশে সাফল্য

১৯৪৮ সালে লন্ডন অলিম্পিকে প্রথমবার যোগদানকারী ভারতীয় বক্সিং দলের বিশেষজ্ঞ কোচ হিসাবে জগৎকান্তকে পাঠানো হয় । এরপরেও ১৯৫২ সালে হেলসিঙ্কি অলিম্পিকেও তিনি ভারতীয় বক্সিং টিমের কোচ ছিলেন । বক্সিং টিম নিয়ে ওই বছরই তিনি বার্মাএখনকার মায়ানমার সফর করেন । ভারত-শ্রীলঙ্কা বাৎসরিক স্কুল চ্যাম্পিয়নশিপ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে ১৯৫৯ ও ১৯৬১ সালে ভারতীয় স্কুল বক্সিং দলের সাথে পরিদর্শক ও বিচারক হিসাবে অংশগ্রহণ করেন । ১৯৬৪ সালে তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান" স্কুল অফ ফিজিক্যাল কালচার” থেকে একটি দল নিয়ে নেপাল ভ্রমণ করেন- যাতে বক্সার ছাড়াও জিমন্যাস্ট ও বডি বিল্ডাররাও ছিল ।

                                     

5. পারিবারিক জীবন

জগৎকান্ত ১৯৩৭ সালে কমলিনীদেবীর সাথে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন । জগৎকান্ত ও কমলিনীর সন্তান ছিলেন সাত জনঃ পাঁচ পুত্র ও দুই কন্যা। জগৎকান্তের সারাজীবন যৌথপরিবারে অতিবাহিত হয় যা পরোক্ষভাবে তাকে একজন সফল সংগঠক ও অধিনায়ক হিসাবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে ।

                                     
  • অমল বস র ক ছ ম ষ ট য দ ধ শ খ ন স ক ল অফ ফ জ ক য ল ক লচ র র প রত ষ ঠ ত জগৎক ন ত শ ল র ও ক মব র জ ব ল অশ ক চ য ট র জ র ক ছ স ত র শ খ ন হ দ য র স ন ট র ল

Users also searched:

...