Back

ⓘ ঝিনাইদহ জেলা




ঝিনাইদহ জেলা
                                     

ⓘ ঝিনাইদহ জেলা

ঝিনাইদহ যশোর জেলার একটি মহকুমা ছিল। ঝিনাইদহ জেলাটি ১৮৬২ সালে মহকুমা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৮৪ সালে এটি একটি পৃথক জেলা হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝিনাইদহ জেলা ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভ করে।

এই জেলার নামকরণ সম্পর্কে কিছুই জানা যায়নি। কথিত আছে যে, ক্যালসিয়াম উৎপাদনের জন্য ‘নবগঙ্গা’ নদী এবং ‘দহা’ নদী থেকে ঝিনুক সংগ্রহের জন্য এই এলাকা বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল। এই জেলার নাম ঝিনাইদহ" ঝিনুক”এবং" দাহ”শব্দদ্বয় থেকে নেয়া হয়েছে বলে মনে করা হয়।

                                     

1. নামকরণ

প্রাচীনকালে বর্তমান ঝিনাইদহের উত্তর পশ্চিম দিকে নবগঙ্গাঁ নদীর ধারে ঝিনুক কুড়ানো শ্রমিকের বসতি গড়ে ওঠে বলে জনশ্রুতি আছে। সে সময় ভারতের পশ্চিমবঙ্গেঁর কোলকাতা থেকে ব্যবসায়ীরা ঝিনুকের মুক্তা সংগ্রহের জন্যে এখানে ঝিনুক কিনতে আসতো। সে সময় ঝিনুক প্রাপ্তির এই স্থানটিকে ঝিনুকদহ বলা হতো। সে সময় ঝিনুক থেকে মুক্তা সংগ্রহের মাধ্যমে এবং ঝিনুক পুড়িয়ে চুন তৈরী করে তা বিক্রি করে মানুষ অর্থ উপার্জন করতো।অনেকের মতে ঝিনুককে আঞ্চলিক ভাষায় ঝিনেই, ঝিনাই এবং দহ অর্থ বড় জলাশয় ও ফার্সি ভাষায় দহ বলতে গ্রামকে বুঝানো হতো। সেই অর্থে ঝিনুকদহ বলতে ঝিনুকের জলাশয় অথবা ঝিনুকের গ্রাম বুঝাতো। আর এই ঝিনুক এবং দহ থেকেই ঝিনুকদহ বা ঝিনেইদহ, যা- রূপান্তরিত হয়ে আজকের ঝিনাইদহ নামকরন হয়েছে।অন্য কিংবদন্তি থেকে জানাযায়, এক ইংরেজ সাহেব এই এলাকা দিয়ে নৌকাযোগে নবগঙ্গাঁ নদী পর হচ্ছিলেন। অনেক লোকজন তখন নদী থেকে ঝিনুক সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত ছিল। উপস্থিত লোকদের কাছে সাহেব তখন এলাকাটির নাম জানতে চান। লোকেরা তার কথা বুঝতে না পেরে ভেবে নেন যে নদী থেকে তারা কি জিনিস তুলছে তার নাম জানতে চাচ্ছেন। এই মনে করে লোকেরা সাহেবকে বলেন ঝিনুক বা ঝিনেই। এতে ইংরেজ সাহেব ধরে নেন জায়গাটির নাম ঝেনি। এই ঝেনি শব্দটি পরে ঝেনিদা হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। ঝিনাইদহকে আঞ্চলিক ভাষায় এখনও ঝিনেদা বলা হয়। ঝেনিদা, ঝিনেদা আর ঝিনাইদহ যাই বলা হোক না কেন ঝিনাইদহ নামের উৎপত্তি যে ঝিনুক থেকে তা এ অঞ্চলের মানুষের কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য।ঐতিহ্যবাহী ঝিনাইদহ গ্রন্থে ঝিনাইদহ সম্পর্কে বলা হয়েছে ‘‘বারো আউলিয়ার আর্শীবাদপুষ্টঃ গাজী-কালূ-চম্পাবতীর উপখ্যানধন্য; কে.পি. বসু, গোলাম মোস্তফার স্মৃতি বিজড়িত; বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান, বিপ্লবী বীর বাঘাযতীনের শৌর্যময়; খেজুর গুড়, কলা-পানের প্রাচুর্যমন্ডিত; পাগলাকানাই, লালন শাহের জম্মস্থান, কপোতাক্ষ, বেগবতী, চিত্রা, নবগঙ্গাঁর ঝিনুকদহ এক কথায় নাম তার ঝিনাইদহ।’’ ঝিনাইদহের নামকরনের ন্যায় এর অপর ৫টি উপজেলারও রয়েছে নাম করনের বৈচিত্রময় ইতিহাস। শৈলকুপাঃশৈলকুপার কুমার নদীতে একসময় নাকি প্রচুর পরিমানে শৈলমাছ পাওয়া যেত এবং তা সাধারণ কুপিয়ে মারা হতো। এজন্যেই এর নাম হয় শৈলকুপা। আবার অন্যদের মতে এখানে শৈলগুল্প বেশি থাকার কারনে এ অঞ্চলকেব শৈলকুপা নামে অভিহিত করা হয়। শৈলকুপা বহু পূর্বে ফরিদপুর জেলার মধ্যে ছিল।মহেশপুরঃভৈরবের তীরে অবস্থিত মহেশপুর উপজেলার আদিনাম যোগীদহ। পরবর্তীতে ১১০৭ সালে হিন্দু দেবতা মহেশপুর ঠাকুরের মন্দির প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় আদিনাম পরিবর্তিত হয়ে মহেশপুর হয়। কেউ কেউ বলেন রাজা মহেশ চন্দ্রের নামানুষারে এলাকার নাম মহেশপুর হয়। অন্য জনশ্রুতি হল ঐ অঞ্চলের রাজত্ব এক জেলে রাজার হস্তগত হলে তার ছেলে ‘‘মহেশ’’ এর নামানুষারে মহেশপুর নামকরন হয়। মহেশপুর ভারতের বনগাঁও মহাকুমার একটি অন্যতম অংশ ছিল। ১৯৪৭ সালে মহেশপুর ঝিনাইদহ মহাকুমার অন্তর্গত হয়। মহেশপুরকে খাদ্যভান্ডার বা রত্নভান্ডার বলা হয়।কালীগঞ্জঃকালীগঞ্জ উপজেলার নামকরনের পিছনে জনশ্রুতি আছে তা হলো এই বাজারে বিখ্যাত কালিমন্দিরকে অবলম্বন করেই কালীগঞ্জ নাম করন হয়।কোটচাঁদপুরঃজনশ্রুতি আছে, জঙ্গলে ঘেরা এ অঞ্চলে চাঁদফকির নামের এক দরবেশ আস্তানা গড়েন। তার নামে এর নাম হয় চাঁদপুর। মোঘল আমলে ১৬১০ সালে একটি কোর্ট নির্মিত হয়। আর চাঁদপুর নামের আগে কোট শব্দটি বসিয়ে এর নাম হয় কোটচাঁদপুর। বৃটিশ আমলে এখানে কোর্ট ছিল এবং ১৮৬২ সাল পর্যন্ত এটি মহাকুমা বাণিজ্য নগরী হিসেবে খ্যাত ছিল।হরিণাকুন্ডুঃলোকমুখে প্রচার আছে ‘‘অভয়কুন্ড নামে এক ইংরেজ কর্মচারীর অত্যাচারী পুত্র হরিচরন কুন্ডুর নামানুষারে এ অঞ্চলের নাম হয় হরিণাকুন্ডু ।

                                     

2. ভৌগোলিক সীমানা

ভৌগোলিক বিস্তৃতি ২৩° ১৩ উত্তর অক্ষাংশ থেকে ২৩° ৪৬ উত্তর অক্ষাংশ পর্যন্ত এবং ৮৮° ৪২ পূর্ব দ্রাঘিমা হতে ৮৯° ২৩ পূর্ব দ্রাঘিমা পর্যন্ত। জেলার আয়তন ১৯৬৪.৭৭ বর্গ কিলোমিটার৭৫৮.৬০ বর্গ মাইল। ঝিনাইদহ জেলার পূর্ব পার্শ্বে মাগুরা জেলা, উত্তরে কুষ্টিয়া জেলা, দক্ষিণে যশোর জেলা ও পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগণা, এবং পশ্চিমে পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগণা ও বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গা জেলা অবস্থিত। ৭টি নদ-নদী প্রবাহিত এ জেলার মধ্য দিয়ে: বেগবতী, ইছামতী, কোদলা, কপোতাক্ষ নদ, নবগঙ্গা নদী, চিত্রা নদী ও কুমার নদী। এ অঞ্চলের জলবায়ু উষ্ণ প্রকৃতির ও সমভাবাপন্ন। বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ২২.২৪° সেলসিয়াস। বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ১৫২.১৯০ সেন্টিমিটার।

                                     

3. প্রশাসনিক এলাকাসমূহ

এই জেলা ৬টি উপজেলা, ৬৭ টি ইউনিয়ন, ৯৪৫ টি মউজা, ১১৪৪ টি গ্রাম, ৬টি পৌরসভা, ৫৪ টি ওয়ার্ড এবং ১৩৬ টি মহল্লা নিয়ে গঠিত। ঝিনাইদহ জেলার উপজেলা গুলো হল:

  • হরিণাকুন্ডু উপজেলা
  • কালীগঞ্জ উপজেলা
  • কোটচাঁদপুর উপজেলা
  • ঝিনাইদহ সদর উপজেলা
  • মহেশপুর উপজেলা
  • শৈলকুপা উপজেলা
                                     

4. জনসংখ্যা

বাংলাদেশের আদমশুমারি ও গৃহগণনা-২০১১ অনুযায়ী, ঝিনাইদহ জেলার জনসংখ্যা হল ১৭,৭১,৩০৪ জন। জনসংখ্যার ঘনত্ব হল ৯০১.৫ জন/বর্গ কিমি। পুরুষ হল জনসংখ্যার ৫০.০৪% এবং মহিলা ৪৯.৯৬%। মুসলমানরা জনসংখ্যার ৯০.৩৯%, হিন্দু ৯.৪৮%, খ্রিস্টান ০.০৬% এবং অন্যান্যরা হল ০.০৮%। সাত বছর বা তার উপরের বয়সীদের মধ্যে ঝিনাইদহে সাক্ষরতার হার ৪৮.৪%।

                                     

5. নদ-নদী

ঝিনাইদহ জেলায় অনেকগুলো নদী রয়েছে। নদীগুলো হচ্ছে কপোতাক্ষ নদী, নবগঙ্গা নদী, গড়াই নদী, কুমার নদ, ডাকুয়া নদী, বেতনা নদী, চিত্রা নদী, ভৈরব নদী ও বেগবতী নদী।

                                     

6. প্রধান ফসল ও ফলমুলঃ

ধান, পান, পাট, গম, আখ, সরিষা,মরিচ, রসুন, পেয়াজ, বিভিন্ন ধরনের ডাল শাকসবজি হলো এই এলাকার প্রধান ফসল।

তাছাড়াও প্রধান ফলমুলের মধ্যে রয়েছে আম, কাঁঠাল, কলা, পেয়ারা,লিচু, নারকেল, খেজুর, তাল,ড্রাগন ইত্যাদি। পাট, ধান, রসুন পেয়াজ, পটল, খেজুর গুড়, পান পাতা প্রয়োজন মিটিয়ে রপ্তানি করা হয়।

                                     

7. অর্থনৈতিক অবস্থা

ঝিনাইদহের অর্থনীতি স্বাধারণত কৃষির উপর নির্ভর্শীল। ৬৬.৫০% বাড়িতে নানা ধরনের ফসল ফলিয়ে থাকেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ধান, পাট, আখ, গম, শাকসবজি,মসলা, ডাল। এছাড়াও ফলমুলের মধ্যে রয়েছে আম, পেয়ারা, কাঁঠাল, কলা, লিচু, নারকেল, খেজুর, তাল ইত্যাদি। এছাড়াও অন্যান্য খাত যেমন প্রবাসী, সরকারী চাকুরীজীবী, গার্মেন্টস কর্মীরাও এখানকার অর্থনীতিতে অনেক অবদান রাখছে।

                                     

8. দর্শনীয় স্থান ও স্থাপনা

নলডাঙ্গা রাজবাড়ি

  • মল্লিকপুর বটগাছ
  • নলডাঙ্গা রাজবাড়ি রিসোর্ট এন্ড পিকনিক স্পট
  • ধান্য হাড়িয়া পূর্বপাড়া জামে মসজিদ, ধান্য হাড়িয়া, যাদবপুর, মহেশপুর।
  • শৈলকুপা জমিদার বাড়ি
  • বারোবাজার প্রত্নতাত্ত্বিক মসজিদ
  • সাতগাছিয়া মসজিদ
                                     

9. শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান

  • শেখ কামাল টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, ঝিনাইদহ
  • কোটচাঁদপুর সরকারি মডেল পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়
  • আমেনা খাতুন কলেজ, নারিকেলবাড়িয়া, ঝিনাইদহ
  • সরকারি নলডাঙ্গা ভুষণ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কালিগঞ্জ
  • ঝিনাইদহ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়
  • ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
  • সলিমুন্নেছা পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়
  • মহেশপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজ
  • ৪২নং মির্জাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
  • ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ
  • ঝিনাইদহ পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট
  • ঝিনাইদহ সরকারি ভেটেরিনারি কলেজ
  • ঝিনাইদহ সরকারি কে,সি, কলেজ
  • নলডাঙ্গা ভূষণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
  • মাহতাবউদ্দিন ডিগ্রী কলেজ,কালিগঞ্জ
  • হাসানহাটি বড় ধোপাদি এবাদৎ আলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়,কালিগঞ্জ, ঝিনাইদহ
                                     

10. উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব

  • বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান - বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বীরশ্রেষ্ঠ;
  • কাজী মুতাসিম বিল্লাহ, ইসলামি পণ্ডিত; জামিয়া শরইয়্যাহ মালিবাগ, ঢাকার মহাপরিচালক ১৯৩৩ - ২০১৩
  • মনির খান - গায়ক;
  • লালন শাহ - বাউল সাধক, গায়ক, গীতিকার;
  • আব্দুর রহমান-ওয়ার্ল্ড ইয়ুথ ফোরাম মিশরের স্পিকার।
  • জামাল নজরুল ইসলাম- দেশ বরেন্য পৃথিবীর বিখ্যাত গণিতবিদ ও পদার্থ বিজ্ঞানী
  • মসিউর রহমান - ঝিনাইদহ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা
  • মুস্তফা মনোয়ার - চিত্রশিল্পী;
  • বাঘা যতীন - বিপ্লবী;
  • পাগলা কানাই - সাধক
  • গোলাম মোস্তফা - কবি;
  • আল-আমিন হোসেন- বোলার, বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল।
  • ইলা মিত্র - তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম নেতা
  • লতিফুর রহমান - বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা;