Back

ⓘ বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকার




বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকার
                                     

ⓘ বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকার

তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাংলাদেশের অধুনালুপ্ত একপ্রকারের শাসন ব্যবস্থা, যার অধীনে দুইটি নির্বাচিত সরকারের মধ্যবর্তী সময়কালে সাময়িকভাবে অনির্বাচিত ব্যক্তিবর্গ কোন দেশের শাসনভার গ্রহণ করে থাকে। সাধারণত নির্বাচন পরিচালনা করাই এর প্রধান কাজ হয়ে থাকে। ২০১১ সালের ১০ মে বাংলাদেশে সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায় দেয়। এছাড়াও বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এ সরকার ব্যবস্থাকে বাতিল করা হয়।

বাংলাদেশের সংবিধানের সংশোধনী অনুসারে দুই নির্বাচনের মধ্যকার সময়ে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ৩ মাসের জন্য ক্ষমতা গ্রহণ করে। এসময় সুপ্রিম কোর্ট হতে সর্বশেষ অবসর গ্রহণকারী প্রধান বিচারপতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তাকে এক দল নিরপেক্ষ উপদেষ্টামণ্ডলী সাহায্য করে থাকে। তবে এসময় সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্ব রাষ্ট্রপতির হাতে থাকে।

একটি মত অনুসারে এ অভিনব পদ্ধতি প্রথম প্রস্তাব করেন আশির দশকে জামায়াতের তৎকালীন আমির গোলাম আযম। তিনি বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটে জামায়াত আয়োজিত এক জনসভায় এ ফর্মুলা পেশ করেন। আবার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর পক্ষ থেকে দাবী করা হয় এই পদ্ধতির উদ্যোক্তা তারাই। বিএনপির নেতা নাজমুল হুদাও নিজেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রস্তাবক হিসেবে দাবি করেন। তিনি বাংলাদেশের বেসরকারি টিভি চ্যানেল আই-এর তৃতীয় মাত্রা অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য বিএনপি তাকে পঞ্চম জাতীয় সংসদের মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ করে। সাম্প্রতিককালে ২০০৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সিএম শফি সামী বলেন, বাংলাদেশের সমস্যাগ্রস্ত আমলাতন্ত্রের কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন হয়েছে।

                                     

1. প্রেক্ষাপট

১৯৮১ থেকে গণতন্ত্রের দাবিতে দীর্ঘ নয় বছরের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতন ঘটে৷ এরশাদ সরকারের পতনেপর সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন৷ শাহাবুদ্দিন আহমদের অধীনে ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিএনপি সবচেয়ে বেশি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এই নির্বাচনে সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ আনেন। কিন্তু তিনি এই নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়ে শপথ গ্রহণ করেন। সেই থেকে পঞ্চম সংসদের যাত্রা শুরু হয়। বিএনপি সরকার গঠন করার কিছুদিন পর থেকেই বিরোধী দলগুলো সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংযোজনের জন্য সরকারকে চাপ দিতে থাকে৷

                                     

2. বিল উত্থাপন

সর্বপ্রথম জামায়াত এবং তারপর আওয়ামী লীগ ১৯৯৩ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত বিল সংসদ সচিবালয়ে পেশ করে৷ এতে বলা হয়, জাতীয় নির্বাচনকে অবাধ ও নির্বাচনের সামগ্রিক প্রক্রিয়াকে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবমুক্ত করার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবিধানে সংযোজন করা উচিত৷ কিন্তু বিএনপি প্রথম থেকেই এ দাবি অসাংবিধানিক বলে অগ্রাহ্য করতে থাকে। ১৯৯৪ সালের ২৭ জুন সংসদ ভবনে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ, জামায়াত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করে৷ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ওই রূপরেখাকে অসাংবিধানিক ও অবাস্তব বলে ঘোষণা করেন৷। বেগম জিয়া বলেন, একমাত্র পাগল ও শিশু ছাড়া কোন মানুষের পক্ষে নিরপেক্ষ হওয়া সম্ভব নয় । কমনওয়েলথ মহাসচিব সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মাঝে সমঝোতার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন৷ এরপর নভেম্বরে কমনওয়েলথ মহাসচিবের প্রতিনিধি স্যার নিনিয়ান সমঝোতা প্রচেষ্টা চালান; কিন্তু তিনিও ব্যর্থ হন।

                                     

3. আন্দোলন

৬ ডিসেম্বর ১৯৯৪ আওয়ামী লীগ, জামায়াত আলাদা সমাবেশ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নেয়ার জন্য সরকারকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেয়৷ সরকার তার অবস্থানে অনড় থাকায় ২৮ ডিসেম্বর বিরোধী দলের ১৪৭ জন সংসদ সদস্য পদত্যাগপত্র পেশ করে৷ ২৩ ফেব্রুয়ারি স্পিকার তাদের পদত্যাগপত্র গ্রহণযোগ্য নয় বলে রুলিং দেন। ১৯৯৫ সালের ১৯ জুন বিরোধী সংসদ সদস্যদের পরপর ৯০ কার্যদিবস সংসদে অনুপস্থিতি পূর্ণ হয়। এতে সংসদে তাদের আসন শূন্য হবে কি-না এ নিয়ে বিতর্কে সরকারি দল ও স্পিকারের মাঝে মতদ্বৈততা দেখা দেয়। এ অবস্থায় প্রেসিডেন্ট সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ মোতাবেক পদত্যাগী সংসদ সদস্যদের আসন শূন্য হবে কিনা জানতে চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের কাছে পরামর্শ চান৷ সুপ্রিম কোর্ট পদত্যাগী সংসদ সদস্যদের আসন শূন্য হওয়ার পক্ষে মত দেন৷ ৩১ জুলাই ১৯৯৫ সংসদ সচিবালয় থেকে ৮৭ জন বিরোধী সংসদ সদস্যের আসন শূন্য বলে ঘোষণা করা হয়৷ এছাড়া যে ৫৫ জন বয়কটকালে হাজিরা খাতায় সই করেছিলেন তাদের সংসদ সচিবালয় থেকে চিঠি দিয়ে জানতে চাওয়া হয়, যেদিন তারা হাজিরা খাতায় সই করেছিলেন সেদিন বৈঠকে তারা উপস্থিত ছিলেন কি-না৷ সংসদ সদস্যরা এ চিঠির কোনো উত্তর দেননি৷ অবশেষে ৭ আগস্ট ওই ৫৫ জনের আসনও শূন্য ঘোষণা করা হয়৷ নির্বাচন কমিশন ১৪২টি শূন্য আসনে ১৭ সেপ্টেম্বর উপ-নির্বাচনের ঘোষণা দেয়৷ পরে বন্যার কারণে উপ-নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে ১৫ ডিসেম্বর ধার্য করা হয়৷ কিন্তু বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়৷ তারা সরকারের পদত্যাগ, সংসদ বাতিল ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ২ সেপ্টেম্বর থেকে একটানা ৩২ ঘণ্টা হরতাল পালন করে৷ ৬ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনা আবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন।

প্রধানমন্ত্রী এ প্রস্তাব অসাংবিধানিক ও অযৌক্তিক বলে বাতিল করে দেন৷ প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলগুলোকে আলোচনার জন্য ডাকেন৷ কিন্তু বিরোধী দলগুলো আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে৷ এরপর ১৬ নভেম্বর ১৯৯৫ থেকে একাধারে ৭ দিন হরতাল পালিত হয়৷ হরতাল আর অবরোধের ফলে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি চরম দুরবস্থার মুখোমুখি হয়৷ সরকার উপ-নির্বাচনে না গিয়ে ২৪ নভেম্বর জাতীয় সংসদ ভেঙে দেয় এবং ১৮ জানুয়ারি ১৯৯৬ সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়৷ পরে তৃতীয়বারের মতো তারিখ পরিবর্তন করে নতুন তারিখ দেয়া হয় ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি৷ সব বিরোধী দল এ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়৷ বিরোধী দলগুলোর প্রতিরোধের মুখে ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়৷ দেশব্যাপী সহিংসতায় কমপক্ষে ১৫ জন নিহত হয়৷ সারা দেশ রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় নিপতিত হয়৷ ২৪, ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বিরোধী দলের আহ্বানে দেশব্যাপী অসহযোগ পালিত হয়৷ ৩ মার্চ জাতির উদ্দেশে ভাষণে খালেদা জিয়া ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল আনার ঘোষণা দেন৷ কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় ষষ্ঠ সংসদ বাতিল ও পদত্যাগ সম্পর্কে কোনো কথা না থাকায় বিরোধী দলগুলো তাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখে৷ ৬ মার্চ হরতাল ডাকা হয়৷ ওই দিন সিরাজগঞ্জ-৩ আসনের পুনঃনির্বাচনে সহিংসতায় ৯ জন নিহত হয়৷ এরপর ৯ মার্চ থেকে সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত বিরোধী দলগুলো লাগাতার অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে৷ এই অসহযোগের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে রাষ্ট্রপতি সংলাপ আহ্বানের জন্য বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় করেন৷ প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর চিঠি বিনিময় হয়৷ পাঁচ বুদ্ধিজীবী বিভিন্নভাবে সমঝোতার চেষ্টা করেন৷ কিন্তু সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।



                                     

4. জনতার মঞ্চ

২৩ মার্চ প্রেস ক্লাবের সামনে সচিবালয়ের কর্মকর্তারা তাদের চাকুরির নিয়ম ভঙ্গ করে জনতার মঞ্চ স্থাপন ও সরকার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত অবস্থান ধর্মঘটের ডাক দেয়।এমনকি ডেসকোর লোকজন গণভবনের বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ মার্চ সরকার নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল জাতীয় সংসদে পাস করে৷ ২৮ মার্চ সচিবালয়ের ভেতরে ১৪৪-ধারা জারি করে এবং সচিবালয়ের ভেতরে-বাইরে সেনাবাহিনী, পুলিশ মোতায়েন করেও বিক্ষুব্ধ সচিবালয়কে নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার ব্যর্থ হয়৷

                                     

5. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাশ

অসহযোগ আন্দোলনের মাঝেই ১৯ মার্চ খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হয় এবং ষষ্ঠ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে৷ কিন্তু সারা দেশে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা শুরু হয়৷ সরকার ২১ মার্চ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল সংসদে উত্থাপন করে৷ ২৬ মার্চ সরকার নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়৷ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে ৩০ মার্চ রাষ্ট্রপতি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেয় এবং খালেদা জিয়া পদত্যাগ করেন৷ রাষ্ট্রপতি সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করেন৷

                                     

6. সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী আইন, ১৯৯৬

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবলিত বাংলাদেশের সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধন আইন, ১৯৯৬ সালের ২৬ মার্চ ষষ্ঠ সংসদের প্রথম অধিবেশনে ২৬৮-০ ভোটে পাস হয়৷ ২৮ মার্চ রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভেপর এটি আইনে পরিণত হয়৷ এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে চতুর্থ ভাগে" ২ক পরিচ্ছদ: নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার” নামে নতুন পরিচ্ছেদ যোগ হয়৷ এতে ৫৮ক, ৫৮খ, ৫৮গ, ৫৮ঘ ও ৫৮ঙ নামে নতুন অনুচ্ছেদ সন্নিবেশিত হয়৷ এছাড়া সংবিধানের ৬১, ৯৯, ১২৩, ১৫৭, ১৫২ অনুচ্ছেদসহ তৃতীয় তফসিলের বিধান সংশোধন করা হয়৷

তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংশোধনী অনুযায়ী দুভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়:

  • মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়াপর ১৫ দিনের মধ্যে।
  • কোন কারণে সংসদ ভেঙে দেয়া হলে সংসদ ভেঙে দেয়ার ১৫ দিনের মধ্যে।
                                     

7.1. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন উপদেষ্টা হওয়ার যোগ্যতা:

উপদেষ্টা হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত যোগ্যতা থাকতে হবে:

  • আসন্ন সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী নন বা প্রার্থী হবেন না এ মর্মে লিখিতভাবে সম্মত হয়েছেন
  • ৭২ বছরের অধিক বয়স্ক নন
  • তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের বা রাজনৈতিক দলের কোনো সংগঠনের সদস্য হবেন না
  • সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে
                                     

7.2. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন প্রধান উপদেষ্টা কাকে নিয়োগ দেয়া যাবে

  • বাংলাদেশের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিগণের মধ্যে যিনি সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত হয়েছেন
  • যদি কোনো অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে পাওয়া না যায় অথবা তিনি যদি প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণে অসম্মতি জানান তাহলে আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারকগণের মধ্যে যিনি সর্বশেষে অবসরপ্রাপ্ত হয়েছেন
  • যদি সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে পাওয়া না যায় অথবা তিনি যদি প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান তাহলে তার অব্যবহিত পূর্বে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে
  • উপরোক্ত কাউকে না পাওয়া গেলে প্রেসিডেন্ট তার স্বীয় দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে নির্দলীয় কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন৷
  • যদি আপিল বিভাগের কোনো অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে না পাওয়া যায় অথবা তিনি যদি প্রধান উপদেষ্টার পদ নিতে অসম্মতি জানান তাহলে প্রেসিডেন্ট প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শক্রমে কোনো ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ দেবেন৷
                                     

7.3. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন পদমর্যাদা ও কার্যাবলী

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ‘প্রধান উপদেষ্টা’ প্রধানমন্ত্রীর পদমর্যাদা এবং পারিশ্রমিক ও সুযোগ-সুবিধালাভের অধিকারী হবেন। উপদেষ্টাগণ মন্ত্রীর পদমর্যাদা এবং পারিশ্রমিক ও সুযোগ-সুবিধা পাবেন৷

                                     

7.4. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন কার্যাবলি

  • দৈনন্দিন কার্যাবলি সম্পাদন ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার কোনো নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন না৷
  • শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য এই সরকার নির্বাচন কমিশনকে সার্বিক সাহায্য করবে৷
                                     

8. তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৬

চতুর্থ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয় ২০০৬ সালে। প্রথমে ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ এই সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নিয়োগ দেওয়া উপদেষ্টাদের মধ্যে চার জন একমাসের ঊর্ধ্বে কাজ করাপর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের সাথে মতানৈক্যের অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করেন। এরা হলেন ড. আকবর আলি খান, লে.জে. হাসান মশহুদ চৌধুরী, সি. এম. শফি সামী ও সুলতানা কামাল চক্রবর্তী। পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ নতুন চার উপদেষ্টাকে নিয়োগ দেন। এরা ছিলেন, বেসরকারি সংস্থা আশার প্রধান সফিকুল হক চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক এম মইনউদ্দিন খান, মেজর জেনারেল রুহুল আমিন চৌধুরী ও ড. শোয়েব আহমেদ। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঠিক করা হয় জানুয়ারি ২২, ২০০৭। নতুন উপদেষ্টা পরিষদ বিবাদমান রাজনৈতিক দল গুলোকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাতে বাধ্য হন। একপর্যায়ে সকল প্রধান উপদেষ্টাসহ সকল উপদেষ্টা পদত্যাগ করেন। রাষ্ট্রপতি দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন । বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে নতুন প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ড. ফখরুদ্দীন আহমদ দশজন নতুন উপদেষ্টা নিয়োগ দিয়ে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাজ শুরু করেন এবং সেই সাথে রাষ্ট্রপতি ২২ জানুয়ারির নির্বাচন বাতিন ঘোষণা করেন। ২৬ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে দেশে সকল রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করেন।

এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুর্নীতি-বিরোধী বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তারা ২০০৭ এর অগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রায় ১৭০ জন শীর্ষ নেতাকে দুর্নীতির অভিযোগে আটক করে। প্রধান দুইটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রধান শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়াকেও দুর্নীতির দায়ে গ্রেফতার করে। নেত্রীদ্বয়ের পরিবারের বিভিন্ন সদস্যকেও দুর্নীতির দায়ে আটক করা হয়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান যেমন, নির্বাচন কমিশন, জনপ্রশাসন কমিশনের সংস্কার করেছেন। নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করেন তারা ২০০৮ এর ডিসেম্বরের মধ্যে একটি ভালো নির্বাচন পরিচালনা করতে পারবেন।



                                     

9. তত্ত্বাবধায়ক সরকার, ২০০১

তৃতীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন বিচারপতি লতিফুর রহমান। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় ঐক্যজোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে সরকার গঠন করে। আওয়ামী লীগ মোট ৩০০ টি আসনের মধ্যে ৫৮ টি আসনে জয়লাভ করে। দেশে বিদেশে এই নির্বাচন ব্যাপক প্রশংসা লাভ করলেও আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে স্থূল কারচুপির অভিযোগ তোলে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন তারা নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করবেন ও শপথ নেবেন না। পরে অবশ্য আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্যগণ শপথ নেন, এবং সংসদে যোগ দান করেন।

                                     

10. তত্ত্বাবধায়ক সরকার, ১৯৯৬

দ্বিতীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে। ১৯৯৬ সালে বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বাংলাদেশের সর্ব প্রথম সংবিধানসম্মত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে ১৪৭ আসন লাভ করে এবং জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে। বিএনপি এই নির্বাচনে ১১৬ টি আসনে জয়লাভ করে দেশের সবচেয়ে বৃহত্তম বিরোধীদল হিসেবে সংসদে যোগ দেয়।

                                     

11. তত্ত্বাবধায়ক সরকার, ১৯৯১

বাংলাদেশের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংবিধান সম্মত ছিল না। সকল দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ প্রধান উপদেষ্টা হতে রাজি হন। তবে তার শর্ত ছিল, দায়িত্ব পালন শেষে তাকে আবার নিজ কাজে ফিরে যেতে দিতে হবে। সকল দল এতে রাজি হন এবং বিএনপি সরকার গঠন করে সংবিধান সংশোধন করে তাকে আবার প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালনে ফেরত পাঠায়। ১৯৯১ সালে ঐ সরকারের অধীনের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। কিন্তু আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ তোলে কিন্তু তারা নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেনি।

                                     

12. সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল

২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনী বিলের ২০ ও ২১ নম্বর প্রস্তাবনায় বলা হয়, সংবিধানের ৫৮ক অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত হইবে। সংবিধানের ২ক পরিচ্ছেদে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্ত হইবে। প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা পদসংক্রান্ত ১৫২ অনুচ্ছেদ সংশোধন ও ক্রান্তিকালীন এবং অস্থায়ী বিধানাবলী সংক্রান্ত ১৫০ অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নব্বই দিনের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন: সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব রেখে বিলে বলা হয়, ‘সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে - ক) মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাঙিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙিয়া যাইবার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে; এবং খ) মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভাঙিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙিয়া যাইবার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে’ প্রতিস্থাপিত হবে।