Back

ⓘ বাংলা গোলাপ




বাংলা গোলাপ
                                     

ⓘ বাংলা গোলাপ

বাংলা গোলাপ হলো রোজা গণভুক্ত একটি উদ্ভিদ। এরা দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের কুয়েইচৌ, হুবেই ও সিচুয়ান প্রদেশের স্থানীয় উদ্ভিদ প্রজাতি। সর্বপ্রথম ১৭৬৮ সালে নিকোলস জোসেফ ফল জ্যাকুইন তার অবজারভেশনাম বোটানিক্যারাম গ্রন্থের তৃতীয়, সপ্তম ও ৫৫তম পৃষ্ঠায় Rosa chinensis নামে উদ্ভিদটির বর্ণনা করেন।

                                     

1. বর্ণনা

এরা এক ধরনের গুল্ম-জাতীয় উদ্ভিদ। এরা ১–২ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এরা ঘন হয়ে অনেকটা ঝোপের আকার ধারণ করে। এদের পাতাগুলো পক্ষল, পাতায় ৩–৫টি উপপত্র থাকতে পারে। প্রতিটি উপপত্র ২.৫–৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা এবং ১–৩ সেন্টিমিটার পর্যন্ত চওড়া হতে পারে। বন্য প্রজাতি বা প্রকরণগুলোতে কখনো Rosa chinensis var. spontanea হিসেবে বর্ণিত পাঁচটি ঈষৎ গোলাপি থেকে লাল রঙের পাপড়ি থাকে। এদের ফলগুলো ১–২ সেন্টিমিটার ব্যাসবিশিষ্ট। উদ্ভিদের শক্ত, সরু শাখাগুলোতে উন্মুক্ত, ঈষৎ বাদামি বাকল থাকে। শাখা ও কাণ্ডে বাঁকা, পুরু, সরল কণ্টক বা কাঁটা থাকতে পারে। পর্যায়ক্রমে সজ্জিত পাতা বৃন্ত ও পত্রফলকে বিভক্ত। পাতাগুলো দৈর্ঘ্যে ৫ থেকে ১১ ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে।

উদ্ভিদের বৃন্ত ও র‍্যাকিস সামান্য প্রলম্বিত, গ্রন্থিময় ও লোমশ। এদের পক্ষল পাতায় তিন থেকে পাঁচটি এবং কখনো কখনো সাতটি পর্যন্ত পিনা বা উপপত্র থাকতে পারে। উপপত্রগুলো গোলাকার, প্রলম্বিত গোলাকার, ঈষৎ গোলাকার বা প্রশস্ত কীলকাকৃতির হতে পারে। এগুলো উপর থেকে নিচের দিকে ক্রমশ সরু হয়ে যায়। উপপত্রগুলো ২.৫ থেকে ৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা এবং ১ থেকে ৩ সেন্টিমিটার পর্যন্ত চওড়া হয়। পাতাগুলো প্রায় অনাবৃত এবং এদের উপরিভাগ চকচকে গাঢ় সবুজ রঙের। উপপত্রগুলো মূলত পাতার বৃন্তের সাথে যুক্ত। বৃন্তের মুক্ত অঞ্চল কাণ্ডের সাথে যুক্ত, সম্পূর্ণটি উপরের দিকে উত্থিত এবং প্রায়শই গ্রন্থিময় ও লোমশ হয়ে থাকে।

                                     

1.1. বর্ণনা ফুল

চীনে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাসে উদ্ভিদে ফুল আসে। একটিমাত্র ফুল আসা দুর্লভ। সাধারণত, চার থেকে পাঁচটি ফুল একসাথে ফোটে। ২.৫ থেকে ৬ সেন্টিমিটার লম্বা পেডিসেল লোমশ কিংবা গ্রন্থিময় হয়ে থাকে। এক থেকে তিনটি মঞ্জরিদণ্ড উপরের দিকে উত্থিত থাকে এবং মসৃণ বা গ্রন্থিময় হয়ে থাকে। ফুলগুলোতে মৃদু সুগন্ধ থাকে।

৪ থেকে ৫ সেন্টিমিটার ব্যাসবিশিষ্ট উভলিঙ্গ ফুলগুলো অরীয়ভাবে প্রতিসম এবং দুইটি বৃতিতে বিভক্ত। চাষকৃত উদ্ভিদে ফুলগুলো আরও ঘনসন্নিবিষ্ট বা হালকা হতে পারে। বুনো পরিবেশে এ সকল ধরনের গোলাপ চীন ও ক্রান্তীয় অক্ষাংশের অন্যান্য অঞ্চলে পাওয়া যায়। ফাঁকা পুষ্পাধার অনেকটা ডিম্বাকৃতির গোলাকার বা নাশপাতি আকার। প্রথম অবস্থায় বৃত্যাংশগুলো গোলাকার বা পাতার মতো, সরল বা লোবড। এগুলোর অভ্যন্তরভাগ মসৃণ এবং বহির্ভাগ রুক্ষ বা রোমশ।

রূপভেদের ওপর নির্ভর করে ফুলগুলোতে গোলাপি থেকে লাল বা রক্তবর্ণের পাঁচ বা তার বেশি সংখ্যক পাপড়ি থাকে। পাপড়িগুলো অবোভেট ধরনের; অর্থাৎ মূল অংশটি সরু এবং প্রান্তভাগ চওড়া ও মসৃণ। ফুলে বহু পুংকেশর বিদ্যমান। মুক্ত ও চুলের মতো স্টাইলাসগুলো পাপড়ির ওপর সজ্জিত এবং পুংকেশরগুলোর প্রায় সমান। চীনে জুন থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত গোলাপের ফলগুলো পাকতে থাকে এবং লালবর্ণ ধারণ করে। ১ থেকে ২ সেন্টিমিটার ব্যাসবিশিষ্ট মসৃণ ফলগুলো অনেকটা ডিম্বাকৃতির বা নাশপাতি আকৃতির হয়ে থাকে।

                                     

2. চাষাবাদ

চীনে অনেক আগে থেকেই বাগানে চীনা গোলাপ বা বাংলা গোলাপের চাষ হয়ে আসছে। এ কারণে এই প্রজাতির গোলাপের বন্য প্রকরণ ও চাষাবাদকৃত প্রকরণ আলাদা করা কঠিন। উদ্যানকৃষিতে বাংলা গোলাপের বহু জাত সৃষ্টি করা হয়েছে। এই ধরনের গাছগুলো মূলত উদ্যানে শোভাবর্ধক গাছ হিসেবে লাগানো হয়। বিশেষ করে চীনে উদ্যান উদ্ভিদ হিসেবে অনেক ধরনের কাল্টিভার নির্বাচন করা হয়েছে, যা সম্মিলিত" চায়না রোজ” নামে পরিচিত। রোসা জাইগ্যান্টি উদ্ভিদের সাথে এদের বহুল পরিমাণে আন্তঃপ্রজাতিক ঘটিয়ে রোসা × ওডোরাটা জাতের গোলাপ উৎপাদন করা হয়েছে। এদের আরও সংকরায়নের মাধ্যমে চা-গন্ধী গোলাপ বা টি-রোজ এবং হাইব্রিড টি-রোজ উৎপাদন করা হয়েছে। এই জাতগুলো গ্রীষ্মকালে ব্যাপক ফুল উৎপাদন করে বিধায়, এগুলোকে গোলাপের" উদীয়মান” প্রকরণের উৎস হিসেবে গণ্য করা হয়।

                                     

2.1. চাষাবাদ প্রকরণ

ফ্লোরা অব চায়না গ্রন্থে এই প্রজাতির তিনটি প্রকরণ শনাক্ত করা হয়েছে:

  • R. chinensis var. spontanea, কুয়েইচৌ, হুবেই ও সিচুয়ান প্রদেশের স্থানীয় প্রকরণ, এদের পাপড়ির রঙও লাল
  • R. chinensis var. chinensis, চাষাবাদের মাধ্যমে উৎপন্ন, এদের পাপড়ি লালবর্ণের
  • R. chinensis var. semperflorens Curtis Koehne, চাষাবাদের মাধ্যমে উৎপন্ন, এদের পাপড়ি গাঢ় লাল বা রক্তবর্ণ
                                     

3. ব্যবহার

ক্রমপুষ্পায়নের অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্য বাংলা গোলাপ আধুনিক উদ্যানতত্ত্বে গোলাপের নতুন জাত বা প্রকরণ উৎপাদনের জন্য গুরুত্ববাহী। তবে ক্রমাগত পুষ্পায়নের বৈশিষ্ট্যটি বন্য প্রজাতির বাংলা গোলাপে পাওয়া যায় না। এছাড়া বাংলা গোলাপ আরও বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা হয়। অঙ্গজ জননের মাধ্যমে উৎপাদিত কচি উদ্ভিদাংশ, ফুলের কুঁড়ি ও ফুল চোলাই করা হয় এবং সবজি হিসেবে স্যুপে ব্যবহার করা হয়। গোলাপের ফলগুলোর পুরু আবরণ কাঁচা অবস্থায় কিংবা রান্না করে খাওয়া হয়। ফলের বীজের লোমশ অংশ কোনোভাবেই মুখে বা গলায় যাওয়া উচিত নয়; খুব সতর্কতার সাথে এগুলো পরিষ্কার করা উচিত। গোলাপের বীজ ভিটামিন ইয়ের খুব ভালো উৎস। বীজগুলোকে গুঁড়ো করে আটা বা অন্যান্য খাবারের সাথে মিশিয়েও খাওয়া যায়।