Back

ⓘ ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প




                                     

ⓘ ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প

ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প বাঙালি লেখক শহীদুল জহির রচিত গল্পসংকলন। এটি ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাওলা ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত জহিরের তৃতীয় গল্প সংকলন। এতে সাতটি গল্প সংকলিত হয়েছে, যেগুলি ১৯৯৯ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে রচিত। গল্পের পটভূমিতে রয়েছে পুরান ঢাকার ভূতের গলির মানুষের নানা প্রসঙ্গ ও কৌতুহল, রয়েছে বাংলাদেশের গ্রাম, ও মানুষের প্রেম-ভালবাসা, স্বপ্ন এবং স্বপ্নভঙ্গ।

বইয়ের শিরোনামে ডলু নদীর উল্লেখ রয়েছে, যেটি বাংলাদেশের পূর্ব-পাহাড়ি অঞ্চল বান্দরবান ও চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া হয়ে লোহাগাড়া উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত একটি নদী। জহির তার মাধ্যমিক পরীক্ষার পূর্বে কিছুকাল সাতকানিয়ায় ছিলেন এবং সেখানকার আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন।

এই রইয়ের জন্য জহির ২০০৪ সালে কাগজ সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।

                                     

1.1. গল্পসমূহ "কোথায় পাব তারে"

সংকলনের প্রথম গল্প "কোথায় পাব তারে", ১৯৯৯ সালে পুরান ঢাকার দক্ষিণ মৈশুন্দি ও ৩৬ নম্বর ভূতের গলির পটভূমিতে রচিত। শিরোনামে কাওকে খোঁজার হাহাকার, না পাওয়ার বেদনা অথবা ব্যর্থ প্রেম থাকলেও গল্পের আখ্যানে তার বর্ণনা সামান্য। কাাহিনীর মূল চরিত্র আব্দুল করিম। গল্পে তার তরুণ বয়সের প্রসঙ্গ জানা যায়। একই নাম অথবা চরিত্র পাওয়া যায় ১৯৯৮ সালে রচিত "চতুর্থমাত্রা" গল্পে, যেটি ডুমুরখেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প ১৯৯৯ সংকলনে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে পরিণত বয়সের আব্দুল করিমের কাহিনী রয়েছে। ফলে "কোথায় পাবো তারে" গল্পটি "চতুর্থমাত্রা গল্পের সিক্যুয়াল হিসেবেও ভাবা যেতে পারে।

আব্দুল করিম মহল্লার লোকেদের কাছে নিষ্কর্মা, বোকা ও আত্মকেন্দ্রীক হিসেবে পরিচিত। সে তার বাবা খোরশেদ আলমের নাটবল্টুর ব্যবসার হাল ধরতে চায় না, বরং নিজেই অন্য ব্যাবসা করতে চায়। যদিও এ বিষয়ে তার বাবার সাথে তার মতের মিল হয় না। প্রায়ই আব্দুল আজীজ ব্যপারীর সাথে তার সাক্ষাত ঘটে এবং তিনি তাকে ডালপুরি খাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে, এবং আব্দুল করিম ডালপুরি খেয়ে আহাজারি করে, "ডাইলপুরির মইদ্দে ডাইল নাইকা, হুদা আলু!. এই হালারা আলু দিয়া কেমুন ডাইলপুরি বানায়!" সে জানায় যে, তিনি চাইলে সে মৈমনসিং থেকে ডাল এনে সাপ্লাই দিতে পারে। এবং এভাবে সে আব্দুল আজীজ ব্যপারীর নিকট তার মৈমনসিং যাবার কথা এবং ফুলবাড়িয়ায় বন্ধু শেফালির কাছে বেড়াতে যাবার কথা যানায়। এতে আব্দুল আজীজ ব্যপারী সহ মহল্লার লোকেরা উৎসুক হয়ে ওঠে এবং তারা তার এসব কথা বিশ্বাস করতে চায় না। তারা ভাবে যে আব্দুল করিম তাদের সাথে বদমায়েশি, ইয়ার্কি, মশকরা অথবা রসিকতা করছে। তবে একদিন আব্দুল করিম ফুলবাড়িয়া যাবার প্রস্তুতি নিতে থাকলে মহল্লার লোকেরা নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। একই শিরোনামে গগন হরকরার একটি গান রয়েছে।

                                     

1.2. গল্পসমূহ "আমাদের বকুল"

২০০০ সালে রচিত "আমাদের বকুল" গল্পে, পরিবার ও সমাজে পুরুষতন্ত্রের আধিপত্যপ্রবণ মানসিকতার দাপটে নারীর অসিত্মত্বহীনতার বৃত্তান্ত রচনায় জহির জাদুবাস্তবতার প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সুহাসিনী গ্রামের মানুষদের জীবনচিত্র, ভূমিহীন দিনমজুর আকালু শেখ এবং তার স্ত্রী ফাতেমা। বিয়েপর যৌতুক হিসেবে প্রাপ্য একটি বাছুর নিয়ে আকালুর বাড়িতে ফেরাপর গ্রামের কৃষক ও ভূমিহীনদের মধ্যে ঈর্ষা সৃষ্টি হয়। যার মূলে রয়েছে আকালুর নববিবাহিত স্ত্রী ফাতেমার যৌবনদীপ্ত সৌন্দর্য। সংসারের সব কাজেই তার নিপুণতা সত্ত্বেও ফাতেমা গ্রামবাসীর পরশ্রীকাতরতা ও স্বামীর নির্মম আচরণের শিকার হয়। অন্যদিকে শ্বশুরবাড়ি থেকে প্রাপ্ত গাভিটির একবছর পরও গর্ভধারণ না করা এবং পাশাপাশি সে নিজেও গর্ভধারণ না করতে পারায় ফাতেমাকে গ্রামবাসীদের উসকানিমূলক মন্তব্যের মুুখে পড়তে হয়। ফলে আকালু স্ত্রীকে বন্ধ্যত্বের দায়ে অভিযুক্ত করে এবং সেই গাভিটির সঙ্গে তার প্রতিতুলনা করে। এসব দৃশ্যে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর অসিত্মত্বহীনতার সংকট ধরা পড়ে। যদিও পরবর্তীতে আকস্মিকভাবেই কাজলা গাই ও ফাতেমা একই সময়ে গর্ভধারণ করে এবং নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে যমজ সন্তান প্রসব করে। এভাবে ঘটানার পরিবর্তন ঘটতে থাকে এবং এসব ঘটনায় জহির সচেতনভাবেই জাদুবাস্তবতার প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। একদিন হঠাৎ চলতি সংসার এবং আকালুকে ফেলে ফাতেমা চলে যায়। শুরু হয় আকালুর ফাতেমাকে খোঁজার নতুর গল্প।

                                     

1.3. গল্পসমূহ "মহল্লায় বান্দর, আব্দুল হালিমের মা এবং আমরা"

২০০০ সালে রচিত "মহল্লায় বান্দর, আব্দুল হালিমের মা এবং আমরা" গল্পে বানরের গল্পের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জহিরের ভাবনা, জিজ্ঞাসা ও শিল্পাভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে। গল্পের প্রেক্ষাপট পুরান ঢাকার পরিসরে গড়ে ওঠেছে। যেখানে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মহল্লাবাসীর পারস্পরিক সহমর্মিতা এবং লড়াইয়ের প্রচেষ্টার বয়ান। একইসাথে আব্দুল হালিম ও ঝর্ণার প্রণয়ভাবনার মর্মান্তিক বৃত্তান্ত পাওয়া যায়। মূলত মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে স্বদেশপ্রেমের পাশাপাশি নারী-পুরুষের হৃদয়াবেগ এ গল্পের উপজীব্য। পাশাপাশি এক তরুণ মুক্তিযোদ্ধার অপ্রত্যাশিত ও বেদনাদায়ক মৃত্যু ভূতের গলির মহল্লাবাসীকে পরবর্তীকালেও তাদের জীবনের সংকটময় মুহূর্তগুলোকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়।

                                     

1.4. গল্পসমূহ "ইন্দুর-বিলাই খেলা"

"ইন্দুর-বিলাই খেলা" রচিত হয়েছিল ২০০০ সালে। ক্ষমতা চর্চারর বিষয়টি এখানে ইঁদুর এবং বিড়াল হিসেবে চরিত্রায়ন করা হয়েছে। অন্যদিকে দিলুয়ারা বেগম চম্পা ফুলের গাছ লাগিয়ে পারভিন সুলতানার বাড়িতে ছায়া ফেলে ক্ষমতা চর্চার আরেক রূপ প্রদর্শন করে। এ গল্পের প্রেক্ষাপটও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত। আরো দেখানো হয় যুদ্ধশেষে সবাই স্বাধীন নিঃশ্বাস ফেলতে পারলেও, প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয় বীরাঙ্গনাদের। এছাড়াও উঠে এসেছে ভূতের গলির মহল্লার ছেলেদের মারামারি, রাজাকারের উৎপাত, বাড়ি-ঘরে আগুন, প্রতিবেশির ঝগড়া, খুন, ধর্ষণ।

                                     

1.5. গল্পসমূহ "প্রথম বয়ান"

সংকলনের ৫ম গল্প "প্রথম বয়ান" রচিত হয়েছিল ২০০২ সালে। এটি একটি অমিনাত্মক প্রণয় কাহিনী, যেখানে মিলনের আকাঙ্ক্ষার ভিন্ন রূপ চিত্রায়িত হয়েছে। গল্পের একটি চরিত্র প্রেমাকাঙ্ক্ষী আব্দুর রহমান একদিন সন্ধ্যায় বন্ধুর সঙ্গে বসে থাকার সময় সুপিয়া বা শামীমা বা সুলতানা নামের কোন মেয়ে তার কোলে চম্পা ফুলের ডাল ছুড়ে মারে, এবং ঘটনাটি তার মনে গভীর প্রভাব ফেলে। দীর্ঘদিন পরে রহমান সেই মেয়েটির সন্ধান চালায়। কিন্তু তাদের দুজন আলাদা পরিস্থিতিতে বাস করে, যেখানে শুধুমাত্র পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা অবশিষ্ট থাকে।

                                     

1.6. গল্পসমূহ "ডলু নদীর হাওয়া"

"ডলু নদীর হাওয়া" সংকলনে গ্রন্থিত ৬ষ্ঠ গল্প, যেটি ২০০৩ সালে রচিত। গ্রন্থাকারে প্রকাশের পূর্বে "ঐ ডলু নদী দেখা যায়" শিরোনামে গল্পটি কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর সম্পাদিত কথা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। বাংলাদেশের চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ডলু নদী কেন্দ্রীক পটভূমিতে এর কাহিনী গড়ে উঠেছে। গল্পের মূল চরিত্র তৈমুর আলি চৌধুরী এবং সমর্তবানু। তৈমুর আলি মগকন্যা সমর্তবানু ওরফে এলাচিংকে তার ইচ্ছেত বিরুদ্ধে বিয়ে করতে একটি শর্ত বা চুক্তি মানতে রাজি বা বাধ্য হয়। চুক্তিটি হলো, সমর্ত তাকে তৈমুরকে জহর বিষ দিয়ে মারবে। এবং সে তাদের বাসররাতেই বিড়াল মারার মধ্য দিয়ে এই হুমকির সত্যতা প্রমাণ করেছ। ফলে তৈমুর আলি বাধ্য হয়েএই খেলায় অংশগ্রহণ করে। শর্তানুযায়ী সমর্তবানু তার স্বামীকে প্রতিদিন দুটো গ্লাসে পানি দেয়, যার একটিতে বিষ, আরেকটিতে থাকে বিশুদ্ধ পানি। চল্লিশ বছর ধরে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এই খেলা চলে এবং তৈমুর আলি প্রতিদিনই নির্ভুলভাবে পানির গ্লাসটি তুলে নেয়। একদিন কৌতূহলবশত দুটো গ্লাসের পানিই একসঙ্গে পান করায় তৈমুর আলির মৃত্যু ঘটে। তৈমুরের মৃত্যুপর সমর্ত ফিরে যায় আলিকদম- নির্বাসিত সুরতের কাছে। শেষে সমর্তবানুর আঙটিটি সত্যি হীরার ছিল কিনা সেই বিষয়ে সন্দেহ তৈরি হয়, যেটি সে জহর বানানোর জন্য ব্যবহার করত। কাহিনীর শেষেও প্রশ্নটি অমীমাংসিত থেকে যায়। গল্পে প্রেম ও দাম্পত্য জীবনের পরস্পরবিরোধীতা উঠে এসেছে।



                                     

1.7. গল্পসমূহ "আমাদের কুটির শিল্পের ইতিহাস"

১৯৯৫ সালে রচিত এই গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত সর্বশেষ গল্প "আমাদের কুটির শিল্পের ইতিহাস"। এটি বহুমাত্রিক সরবতা নিয়ে বাংলা গল্পসাহিত্যে আলোকময় অস্তিত্ব জানান দেয় বলে মন্তব্য করেছেন, লেখক কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর। গল্পটি পূর্বে জহিরের ডুমুরখেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প ১৯৯৯ সংকলনে প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথম প্রকাশে গল্পটি ডুমুর খেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প নামের বইটিতেও একটা কমা দিয়ে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা যথারীতি "দাঁড়ি" দিয়েই শেষ করা হয়। পরবর্তীতে শুধুমাত্র একটি একটি "কম" যথাস্থানে দেয়ার প্রয়োজনবোধ থেকেই এটি এই সংকলনে তৃতীয় গল্পগ্রন্থ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

                                     

2. সমালোচনা

ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প সম্পর্কে আবদুল মান্নান সৈয়দ মন্তব্য করেছেন যে গ্রন্থে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে র প্রভাব থাকা সত্বেও এতে জহিরের স্বকীয় কৃতিত্ব বিদ্যমান।

                                     

3. জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে

এই বইয়ে সংকলিত "কোথায় পাবো তারে" গল্প অবলম্বনে একই শিরোনামে দুটি বাংলা টেলিভিশন নাটক নির্মিত হয়েছে। প্রথমটি দীপংকর দীপন পরিচালিত টেলিভিশন নাটক, যেটির চিত্রনাট্য রচনা করেছেন সারা জাকের। অন্যটি রচনা এবং পরিচালনা করেছেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।